পায়ে বল পেলেই সবুজ গালিচায় যেন ক্যানভাস আঁকেন লিওনেল মেসি। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেদ করে তাঁর বল নিয়ে ছুটে চলা ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বহুদিন ধরেই জাদুর মতো। তবে মেসির এই দক্ষতা শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ নয়। ফুটবলের বাইরেও তিনি গড়ে তুলেছেন বিশাল এক বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য।
ফোর্বসের হিসাবে, খেলা চালিয়ে যাওয়ার সময় বিলিয়নিয়ার হওয়া বিশ্বের হাতে গোনা চার ক্রীড়াবিদের একজন মেসি। তাঁর নিট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। এই সম্পদের বড় অংশ এসেছে ফুটবল থেকে পাওয়া আয় থেকে, তবে মাঠের বাইরের ব্যবসা ও বিনিয়োগও তাঁর সম্পদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, ক্যারিয়ারে মেসির মোট আয় প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার এসেছে ক্লাব ও জাতীয় দলের বেতন এবং খেলার চুক্তি থেকে। বাকি প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার এসেছে বিজ্ঞাপন, স্মারকসামগ্রী এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড থেকে। অর্থাৎ তাঁর মোট আয়ের উল্লেখযোগ্য একটি অংশই এসেছে মাঠের বাইরে থেকে।
সম্পদ মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান সেলিব্রিটি নেট ওয়ার্থ অবশ্য মেসির নিট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করেছে। দুই প্রতিষ্ঠানের হিসাবে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও মেসির ব্যবসায়িক সাফল্যের বিষয়টি স্পষ্ট। মাঠের আয়কে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদে রূপান্তরের ক্ষেত্রে তিনি লেব্রন জেমস, টাইগার উডস ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মতো ক্রীড়াবিদদের কাতারে রয়েছেন।
ফোর্বসের ২০২৬ সালের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত ক্রীড়াবিদদের তালিকায় মেসি রয়েছেন তৃতীয় স্থানে। গত ১২ মাসে তাঁর মোট আয় আনুমানিক ১৪০ মিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে বিজ্ঞাপন ও ব্যবসায়িক উদ্যোগ থেকে এসেছে প্রায় ৭০ মিলিয়ন ডলার।
মেসির বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যের অন্যতম বড় ভিত্তি স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড অ্যাডিডাস। ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে তিনি আজীবন চুক্তিতে যান। এর বাইরে মাস্টারকার্ড, লে’জ ও মিশেলব আল্ট্রার মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব রয়েছে।
মাঠে যেমন স্থির ও নিয়ন্ত্রিত, বিজ্ঞাপনেও মেসির সেই ভাবমূর্তি কাজে লাগছে। প্রচারবিমুখ ও কম কথা বলার কারণে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে তাঁর শান্ত ও স্থিতিশীল ইমেজ আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে। তাঁর প্রয়াত বাবা হোর্হে মেসির ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে এসব বাণিজ্যিক চুক্তি পরিচালিত হয়ে আসছে।
ব্যবসায়িক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মেসির অন্যতম আগ্রহের জায়গা আবাসন ও আতিথেয়তা খাত। ২০২৪ সালে তিনি ‘এদিফিসিও রোস্তোয়ার সোসিমি’ নামে একটি তালিকাভুক্ত রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট চালু করেন। প্রতিষ্ঠানটি স্পেনের পোর্টফোলিও স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন করছে।
ফোর্বসের হিসাবে, ওই ট্রাস্টের বাজারমূল্য প্রায় ২৮২ মিলিয়ন ডলার। সেলিব্রিটি নেট ওয়ার্থের হিসাবে এর মূল্য প্রায় ২৩২ মিলিয়ন ডলার। প্রতিষ্ঠানটির অধীনে রয়েছে ‘মিম হোটেলস’ চেইনের ছয়টি বিলাসবহুল বুটিক হোটেলসহ স্পেন ও অ্যান্ডোরার বিভিন্ন বাণিজ্যিক সম্পত্তি।
ব্যক্তিগত আবাসনেও মেসির বড় অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে। এর মধ্যে বার্সেলোনার কাস্তেলদেফেলসের বাড়ির মূল্য প্রায় ২ মিলিয়ন ডলার, সানি আইলস বিচের একটি কনডোমিনিয়ামের মূল্য ৭ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার এবং ফোর্ট লডারডেলের সমুদ্রতীরবর্তী বাড়িটির মূল্য প্রায় ১০ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফুটবল মাঠে অসাধারণ পারফরম্যান্স মেসিকে বিশ্বসেরা ক্রীড়াবিদদের একজন করেছে। আর মাঠের বাইরের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত, ব্র্যান্ড অংশীদারত্ব ও সম্পত্তিতে বিনিয়োগ তাঁকে পরিণত করেছে বিশ্বের অন্যতম সফল ক্রীড়া উদ্যোক্তায়।
স্পোর্টস ডেস্ক