চীনা ভাষায় কথা বলা এক হ্যাকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় শতাধিক কোম্পানির ওয়েবসাইটে অনুপ্রবেশ করেছেন। ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে কৃষি সরঞ্জাম নির্মাতা ডিয়ার, গৃহস্থালি সরঞ্জাম কোম্পানি শার্কনিনজা এবং ইঞ্জিন নির্মাতা কামিন্স। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এক সাইবার নিরাপত্তা গবেষক হ্যাকারের এসব কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করেছেন।
এসব ওয়েবসাইটে অনুপ্রবেশের জন্য এআইকে নির্দেশনা দিতে প্রায় ৫ হাজার ডলার খরচ হয়ে থাকতে পারে। সে হিসাবে প্রতিটি ওয়েবসাইট হ্যাক করতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৫০ ডলার।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান নরফোর্জের প্রধান হুমকি-বিষয়ক গবেষক স্নোরে ফাগারল্যান্ড জানান, ওই সাইবার অপরাধী হ্যাকিংয়ের পুরো প্রক্রিয়াটি এআইয়ের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। এআই এজেন্টগুলোকে এমনভাবে কাজে লাগানো হয়েছিল, যাতে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওয়েবসাইট অনুসন্ধান করে দুর্বলতা খুঁজে বের করতে এবং সেগুলোতে অনুপ্রবেশ করতে পারে।
সোমবার প্রকাশের আগে রয়টার্সের কাছে পাঠানো এক প্রতিবেদনে ফাগারল্যান্ড জানান, তিনি ইন্টারনেটে ‘কেয়ার্ন’ নামের একটি ওপেন-সোর্স এআই প্ল্যাটফর্মের অনিচ্ছাকৃতভাবে উন্মুক্ত হয়ে থাকা সংস্করণগুলো খুঁজছিলেন। সমস্যা সমাধানের জন্য তৈরি এই প্ল্যাটফর্মটি হ্যাকারদের মধ্যেও বেশ জনপ্রিয়।
ফাগারল্যান্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২ অক্টোবর থেকে তিনি প্রায় ২৪টি ঘটনায় কেয়ার্নের ক্ষতিকারক ব্যবহারের প্রমাণ পেয়েছেন। সাইবার অপরাধীরা যখন এআই টুলগুলোকে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে হামলার কাজে ব্যবহার করছিল, তখন তিনি তাদের কর্মকাণ্ড গোপনে পর্যবেক্ষণের সুযোগ পান।
ফাগারল্যান্ডের প্রতিবেদনে চীনাভাষী হ্যাকারের কথা উল্লেখ থাকলেও ভুক্তভোগী কোম্পানিগুলোর নাম প্রকাশ করা হয়নি। তবে রয়টার্স হ্যাকারের কেয়ার্ন ব্যবহারসংক্রান্ত কার্যক্রমগুলো স্বতন্ত্রভাবে পর্যালোচনা করে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করেছে।
স্বয়ংক্রিয় এআই টুলের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার মধ্যে ফাগারল্যান্ডের এই আবিষ্কার প্রযুক্তিটির ঝুঁকির একটি বাস্তব উদাহরণ সামনে এনেছে। এটি দেখিয়েছে, বাণিজ্যিকভাবে উপলব্ধ এআই এজেন্ট মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জটিল কাজ সম্পন্ন করতে পারে। ফলে ক্ষতিকর ব্যক্তিদের সক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
ফাগারল্যান্ড বলেন, “আমরা এখন এক নতুন পৃথিবীতে বাস করছি।”
এসব অনুপ্রবেশের ফলে ঠিক কতটা তথ্য অননুমোদিতভাবে চুরি হয়েছে, তা রয়টার্স নিশ্চিত করতে পারেনি।
ডিয়ার রয়টার্সকে জানিয়েছে, ঘটনার পর তারা প্রয়োজনীয় প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে সংবেদনশীল তথ্য চুরি হওয়ার কোনো ইঙ্গিত পায়নি প্রতিষ্ঠানটি।
শার্কনিনজা জানিয়েছে, হ্যাকিংয়ের শিকার ওয়েবসাইটটি ছিল একটি স্বতন্ত্র সাইট, যেখানে শুধু পণ্য-সহায়তাসংক্রান্ত তথ্য ছিল। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, হুমকিটি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।
কামিন্স বলেছে, “আমাদের তৃতীয় পক্ষের কোনো ভেন্ডরের পরিচালিত একটি ওয়েবসাইটে সম্ভাব্য সাইবার হামলার যে প্রতিবেদন পাওয়া গেছে, আমরা তা খতিয়ে দেখছি।”
আরও দুটি ছোট প্রতিষ্ঠানও সাইবার হামলার শিকার হওয়ার কথা স্বীকার করেছে। কেয়ার্নের ডেটায় উল্লেখ থাকা অন্য ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো সাড়া দেয়নি।
সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা, বড় সাইবার হামলা
ফাগারল্যান্ড যেসব হ্যাকারকে পর্যবেক্ষণ করেছেন, তাদের একজন বিপুল পরিমাণ ক্রেডিট কার্ডের তথ্য চুরি করেছেন। আরেকজন এআই এজেন্ট ব্যবহার করে একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে চীনাভাষী হ্যাকারটি ছিল সবচেয়ে সক্রিয়।
২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ওই হ্যাকার তার এআই এজেন্টগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের বিভিন্ন ই-কমার্স ওয়েবসাইটের বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে শুরু করেন।
হ্যাকারের নির্দেশনাগুলো ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। ১০০টিরও কম চীনা অক্ষরে তিনি নিজের পছন্দের অনুপ্রবেশ কৌশলগুলো বর্ণনা করেছিলেন। গত সপ্তাহের শেষ নাগাদ তাঁর এজেন্টগুলো ১ হাজার ২০০টিরও বেশি ওয়েবসাইটে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালায়।
সফলভাবে অনুপ্রবেশের জন্য সাধারণত প্রায় ২৩ ঘণ্টা ধরে দুর্বলতা খোঁজার কাজ চালাতে হয়েছে। ফাগারল্যান্ডের ধারণা, এই অভিযানে সম্ভবত চীনের ডিপসিক এবং অ্যানথ্রোপিকের ‘ক্লড কোড’ ব্যবহারের সমন্বয় ঘটানো হয়েছিল। এতে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ডলার। অর্থাৎ প্রতিটি সফল হ্যাকিংয়ের পেছনে খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ ডলার।
প্রায় তিন দশক ধরে সাইবার নিরাপত্তা খাতে কাজ করা ফাগারল্যান্ড জানান, ভুক্তভোগীদের সিস্টেমে প্রবেশ করতে এআই এজেন্টগুলো যেসব কৌশল ব্যবহার করেছে, তা দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন।
একটি ঘটনায়, বড় একটি কোম্পানির জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত অ্যাপ্লিকেশনে দুর্বলতা খুঁজে পেতে ব্যর্থ হওয়ার পর এআই এজেন্টগুলো ডিজিটাল রেকর্ড ঘেঁটে সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো খুঁজে বের করে। পরে তারা একটি উন্মুক্ত কন্ট্রোল প্যানেল শনাক্ত করে এবং সেটির ডেটা প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতিতে সূক্ষ্ম একটি দুর্বলতা খুঁজে পায়। দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন প্রচেষ্টার পর সেই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সার্ভারকে বিভ্রান্ত করে ক্ষতিকর কমান্ড কার্যকর করাতে সক্ষম হয় তারা।
ফাগারল্যান্ড বলেন, “এ ধরনের সমাধান বের করা মোটেও সহজ কাজ নয়। এটি কোনো সাধারণ শৌখিন হ্যাকারের কাজ হতে পারে না।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে কেয়ার্ন জানিয়েছে, তাদের প্ল্যাটফর্মটি একটি উদ্ভাবনী মাল্টি-এজেন্ট আর্কিটেকচার, যা হ্যাকিং আক্রমণের জন্য তৈরি করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য, “যদি এটি ক্ষতিকারক হ্যাকিং আক্রমণ চালানোর কাজে ব্যবহৃত হয়, তবে তা আমাদের উদ্দেশ্য নয়।”
তদারকির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ
এআই এজেন্টভিত্তিক ব্যবস্থাগুলোর স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুর্বলতা শনাক্ত করা, অনুপ্রবেশ ঘটানো এবং তথ্য চুরি করার সক্ষমতা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বড় এআই কোম্পানিগুলোর অসাবধানতায় উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া কিছু অনিয়ন্ত্রিত এআই এজেন্ট কম্পিউটার ল্যাবের গণ্ডি পেরিয়ে সরকারি ওয়েবসাইটে অনুপ্রবেশ করেছে এবং অননুমোদিত সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে কয়েকটি আলোচিত হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটেছে, যার পেছনে এআই ব্যবহারকারী সাইবার অপরাধীদের হাত রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সাইবার অপরাধীদের জগতে এআই এজেন্ট ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠছে। আগস্টে ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান গ্যামবিট সিকিউরিটি দেখতে পায়, রুশভাষী চাঁদাবাজরা স্পেসএক্সের ‘কার্সার এআই’ টুল ব্যবহার করে সাতটি প্রতিষ্ঠানে অনুপ্রবেশ করেছে।
সেপ্টেম্বরে গ্যামবিট এআই এজেন্ট পরিচালিত একটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নথিপত্র প্রকাশ করে। ওই ঘটনায় ২৫টি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা লঙ্ঘিত হয় এবং অন্তত ৬ লাখ ক্রেডিট কার্ডের তথ্য চুরি হয়। গত সপ্তাহে সাইবার গোয়েন্দা সংস্থা বিটসাইট জানিয়েছে, সাইবার অপরাধীদের বিভিন্ন ফোরামে স্বয়ংক্রিয় এজেন্ট ব্যবহারের কৌশল নিয়ে আলোচনার হার ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
ফাগারল্যান্ড জানান, আগে তিনি মনে করতেন, হ্যাকিংয়ে ব্যবহৃত এআই এজেন্টগুলোর অন্তত কিছুটা তদারকি প্রয়োজন হবে। তবে এখন স্পষ্ট যে প্রযুক্তিটি সেই পর্যায় অনেক আগেই অতিক্রম করেছে।
তিনি বলেন, “এই ক্ষেত্রে যে উন্নয়ন ঘটেছে, তা সত্যিই বিস্ময়কর।”
সূত্র: রয়টার্স
আইটি ডেস্ক