ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রয়োজন অনুযায়ী সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির অভিযোগ, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে সংশয় থাকায় শুধু পুলিশ মোতায়েন করে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।
রোববার (২৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার।
ছয় সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন তিনি। বৈঠকে দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ ও ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদও বৈঠকে অংশ নেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আগামী ২৯ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও ঢাকা মহানগরী জামায়াতের সেক্রেটারি দেলাওয়ার হোসেন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছোট ভাই মির্জা ফয়সল আমিন।
তিনি জানান, জামায়াতের কেন্দ্রীয় একটি দল গত শনিবার নির্বাচনী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ঠাকুরগাঁওয়ে যায়। সরেজমিনে পরিদর্শন, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রোববার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে লিখিতভাবে নয় দফা অভিযোগ ও তিনটি দাবি তুলে ধরা হয়েছে।
জামায়াতের এই নেতা বলেন, প্রায় এক ঘণ্টা ধরে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে অভিযোগগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অভিযোগের সমর্থনে ছবি, আহত ব্যক্তিদের ছবি এবং নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ কমিশনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে কমিশনের বক্তব্যে তারা পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারেননি।
প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ
মিয়া গোলাম পরওয়ারের অভিযোগ, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাইরুল ইসলাম নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন। তাঁর দাবি, এক প্রার্থী রাতে ইউএনওর বাড়িতে গেছেন এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালানোর অভিযোগ তোলেন তিনি।
জামায়াতের এই নেতা আরও অভিযোগ করেন, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন ও নেতাকর্মীদের ওপর হামলার বিষয়ে অভিযোগ দিয়েও কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁদের নারী ও পুরুষ নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়ে আহত করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতায় রাজনৈতিক চাপের মুখে পুলিশ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে কি না, তা নিয়ে তাঁদের সংশয় রয়েছে। এ কারণেই তাঁরা প্রয়োজন অনুযায়ী সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছেন।
ধর্মীয় স্থান ও সরকারি সেবা ব্যবহারের অভিযোগ
মিয়া গোলাম পরওয়ারের দাবি, ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাচনী প্রচারে ধর্মীয় স্থান ব্যবহার, রঙিন প্রতীক প্রদর্শন এবং নির্ধারিত সময়ের আগে মাইক ব্যবহারের মতো আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। তাঁর অভিযোগ, একটি মসজিদের ভেতরে সোফা বসিয়ে ধানের শীষের প্রার্থী নির্বাচনী সভা করেছেন।
এ ছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ে মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন করে সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত চিকিৎসকদের মাধ্যমে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার অভিযোগও তোলেন তিনি। এসব কার্যক্রম ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে করা হচ্ছে বলে দাবি করেন জামায়াতের এই নেতা। তাঁর ভাষ্য, এ-সংক্রান্ত ছবি, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও বিস্তারিত তথ্য নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে।
এসব অভিযোগের ভিত্তিতে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাইরুল ইসলামকে অপসারণের দাবিও জানিয়েছে জামায়াত। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ভোটার রয়েছেন। তাঁদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পেয়েছেন তাঁরা। সরকারি চাকরিজীবী, স্কুল-কলেজের শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশার ভোটারদের দাঁড়িপাল্লার পক্ষে কাজ করলে চাকরি নিয়ে সমস্যায় পড়তে পারেন—এমন ভয় দেখানো হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগের কারণে ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাইয়ের তথ্য পাওয়া যায়নি।
মাগুরা উপনির্বাচনের প্রসঙ্গ
১৯৯৪ সালের মাগুরা উপনির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের নির্বাচন যেন সেই নির্বাচনের মতো পরিস্থিতিতে না পড়ে, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক করেছেন তাঁরা। তাঁর ভাষ্য, মাগুরা উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৎকালীন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলন জোরালো হয়েছিল এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি সামনে এসেছিল।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, রিটার্নিং কর্মকর্তা বা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর সব দায়িত্ব ছেড়ে না দিয়ে কমিশনকে নিজস্ব ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে।
নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে না জামায়াত
নির্বাচন বর্জনের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, তাঁরা এখনো নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াননি। ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে দেলাওয়ার হোসেনকে মনোনয়ন দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা।
তিনি জানান, নির্বাচন কমিশন অভিযোগগুলো নিয়ে আলোচনা, স্থানীয় পর্যায়ে যোগাযোগ এবং নিজেদের এখতিয়ারের মধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে কমিশনের বক্তব্যে তাঁরা পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারেননি।
সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতীতে রাজনৈতিক নির্দেশের কারণে পুলিশ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনে বাধার মুখে পড়েছে বলে তাঁদের অভিজ্ঞতা রয়েছে। অন্যদিকে, সেনাবাহিনী দলনিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম বলে তাঁরা মনে করেন। এ কারণেই সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানানো হয়েছে।
জি বাংলা ডেস্ক