দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, তেল মজুত বাড়ানো এবং নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কীভাবে দ্রুত দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানো যায়, তা নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলে নিয়মিত বৈঠক ও পর্যালোচনা চলছে। বিশেষ করে শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পুরো বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই মনিটরিং করছেন বলেও সূত্র জানিয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন করে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো হবে। একই সময়ের মধ্যে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ এবং একটি ল্যান্ডবেইজড টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ৫০০ কোটি ঘনফুটে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
১৫০ কূপ খনন, গ্যাস সরবরাহ ৫০০ কোটি ঘনফুটে উন্নীত
জ্বালানি খাতে সরকারের সবচেয়ে বড় পরিকল্পনার একটি হলো দেশীয় উৎসে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো। ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন করে দৈনিক ১৭৬ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বর্তমানে দেশে দৈনিক প্রায় ২৩০ থেকে ২৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা দৈনিক ৫০০ কোটি ঘনফুটে উন্নীত হবে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান জানিয়েছেন, জ্বালানি খাতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে সরকার সব ধরনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। বিশেষ করে প্রাথমিক জ্বালানি তেল, গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
নতুন এফএসআরইউ ও সমুদ্রব্লকে অনুসন্ধান
গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে আগামী ১০ বছরে আরও চার থেকে পাঁচটি এফএসআরইউ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে দুটি ভাসমান টার্মিনাল স্থাপন করে দৈনিক ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
এ ছাড়া মাতারবাড়ীতে একটি ল্যান্ডবেইজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক আরও ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
স্থানীয় উৎস অনুসন্ধানের পাশাপাশি আমদানিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বিভিন্ন ব্লক বরাদ্দে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এর পাশাপাশি বিদেশি কোম্পানিকে দিয়ে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে শিগগিরই আরেকটি আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা রয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট
বিদ্যুৎ খাতে ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে উৎসাহিত করা। নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ জন্য মার্চেন্ট পাওয়ারের আওতায় বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এর আওতায় উদ্যোক্তারা ব্যাটারিসহ সোলার প্যানেল স্থাপন করে সরকারের বিতরণ কোম্পানির কাছে প্রতি ইউনিট সাড়ে ১০ টাকা দরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবেন।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। সুবিধাটি আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নেওয়া যাবে এবং এর মেয়াদ থাকবে তিন বছর।
তিনটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়াতে ২০৩০ সালের মধ্যে পায়রা, মাতারবাড়ী ও বড়পুকুরিয়ায় তিনটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পায়রা ও মাতারবাড়ীতে কেন্দ্র স্থাপনের জন্য জমি প্রস্তুত রয়েছে। এখন কোন পদ্ধতিতে এসব কেন্দ্র স্থাপন করা হবে, সে বিষয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এসব কেন্দ্র থেকে ২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।
লোডশেডিং কমাতে তেলভিত্তিক কেন্দ্রে ৬ হাজার কোটি টাকা
চলমান বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লোডশেডিং কমাতে এসব কেন্দ্র থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সরকার ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।
এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা বাড়ানোসহ বিদ্যুৎ খাতের অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তেলের মজুত ৯০ দিনে উন্নীত করার পরিকল্পনা
জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে দেশে তেলের মজুত সক্ষমতা ৯০ দিনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশের তেলের মজুত ৩২ দিনের, যা আগে ছিল ১৭ দিনের।
এ ছাড়া ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি-২ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রকল্পের জন্য ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে ১০০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তিও হয়েছে।
কম দামে এলপিজি দেওয়ার উদ্যোগ
নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য ভর্তুকি মূল্যে এলপিজি সরবরাহের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) প্রতি মাসে ৯০ হাজার টনের বেশি এলপিজি আমদানির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে মহেশখালী, কাট্টলী, মাতারবাড়ী, মোংলা ও অ্যালেঙ্গায় এলপিজির ডিপো স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিক জ্বালানির সরবরাহ বাড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রাথমিক জ্বালানি—তেল, গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ বাড়ানো। কারণ এসব জ্বালানি ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প-কারখানা, রান্না ও পরিবহণসহ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো সচল রাখা কঠিন।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২৬০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে স্বাভাবিক সময়ে ১০০ কোটির বেশি ঘনফুট গ্যাস আমদানি করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
অন্যদিকে, বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৭০ লাখ টন। এর ৮০ শতাংশের বেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। বিদ্যুৎ খাতে ব্যবহৃত কয়লার ক্ষেত্রেও আমদানিনির্ভরতা রয়েছে। দেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যেগুলোতে বছরে প্রায় দেড় কোটি টন কয়লা প্রয়োজন।
সংকটের প্রেক্ষাপটে ১০ বছরের পরিকল্পনা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে ১০ বছরের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া এবং আমদানিনির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে।
এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ও ক্রয়মূল্যের ওপরও চাপ তৈরি করেছে। গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়।
সরকারি কর্মকর্তাদের হিসাবে, বেশি দামে তেল কিনে কম দামে বিক্রি করায় এ পর্যন্ত সরকারের লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। একইভাবে বেশি দামে এলএনজি কিনে কম দামে বিক্রি করায় এ খাতে ১৫ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে।
সব মিলিয়ে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান, এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন, তেলের মজুত বাড়ানো এবং গ্রিড সক্ষমতা উন্নয়নের মাধ্যমে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতকে আরও স্থিতিশীল করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
স্টাফ রিপোর্টার