ভর্তুকির পণ্য বিতরণে অনিয়ম, অপচয় কমানো এবং প্রকৃত উপকারভোগী শনাক্ত করতে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যবস্থায় যাচ্ছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। এ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে চালু হচ্ছে ডিজিটাল টিসিবি কার্ড, ‘উপকারী’ মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন ডিলার ব্যবস্থাপনা, অল-ইন-ওয়ান পিওএস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) রিয়েল-টাইম মনিটরিং।
বৃহস্পতিবার টিসিবির সম্মেলন কক্ষে সংস্থাটির ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের জন্য সেবা সহজ, স্বচ্ছ ও মর্যাদাপূর্ণ করার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় কার্ড হারিয়ে গেলেও প্রকৃত উপকারভোগী পণ্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন না। ‘উপকারী’ অ্যাপের মাধ্যমে ডিজিটাল পরিচয় ও এনক্রিপ্টেড কিউআর কোড ব্যবহার করে উপকারভোগীর পরিচয় এবং পণ্য পাওয়ার যোগ্যতা যাচাই করা হবে।
বাদ পড়েছেন ৫৯ লাখ অযোগ্য আবেদনকারী
টিসিবির ডিজিটাল রূপান্তরের আগে উপকারভোগীর তালিকা যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে প্রায় ৫৯ লাখ অযোগ্য আবেদনকারীকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে একটি যাচাইকৃত ডিজিটাল ডেটাবেস তৈরি করা হয়েছে।
বর্তমানে প্রায় ৭৯ লাখ উপকারভোগী টিসিবির সেবার আওতায় রয়েছেন। ভবিষ্যতে এ সংখ্যা এক কোটিতে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এতে একই ব্যক্তির একাধিক সুবিধা নেওয়া কিংবা অযোগ্য ব্যক্তির তালিকায় থাকার ঝুঁকি কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পণ্য বিক্রি ও নজরদারিতে প্রযুক্তি
নতুন ব্যবস্থায় অল-ইন-ওয়ান পিওএসের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি, বায়োমেট্রিক যাচাই, অনলাইন পেমেন্ট এবং তাৎক্ষণিক বিক্রয় রশিদের ব্যবস্থা থাকবে। এআইভিত্তিক রিয়েল-টাইম মনিটরিংয়ের মাধ্যমে কোন এলাকায় কত পণ্য বিতরণ হচ্ছে, বিক্রির গতি কেমন এবং কোথাও অস্বাভাবিকতা দেখা দিচ্ছে কি না—তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
উপকারভোগীদের তথ্য ও সহায়তার জন্য এআইভিত্তিক কন্টাক্ট সেন্টার চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
ডিলার ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। অনলাইন ডিলার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে আবেদন, তথ্য সংরক্ষণ ও নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে। আবেদনকারী বেশি হলে ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে ডিলার নির্বাচনের সুযোগ থাকবে। পাশাপাশি অনলাইন পেমেন্ট কালেকশন ব্যবস্থাও চালুর উদ্যোগ রয়েছে।
৩৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত সাশ্রয়ের আশা
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, টিসিবির ডিজিটাল রূপান্তর ও ব্যবস্থাপনা সংস্কারের ফলে চলতি অর্থবছরে গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি সাশ্রয় হতে পারে। আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যে প্রযুক্তির ব্যবহার, সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভর্তুকির অপচয় আরও কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের সরবরাহব্যবস্থায় এখনো উৎপাদক থেকে ভোক্তাপর্যায়ে দামের বড় ব্যবধান রয়েছে। কোথাও কোথাও সাময়িক সরবরাহ ঘাটতিও বাজারে অস্থিরতা তৈরি করে। এ অবস্থায় স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দিতে টিসিবির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
ভোক্তা অধিকার সেবাতেও ডিজিটাল ব্যবস্থা
টিসিবির পাশাপাশি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও অনুষ্ঠানে জানানো হয়। নিরাপদ ও মানসম্মত পণ্য নিশ্চিত করতে জনবল, প্রশিক্ষণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হবে। পর্যায়ক্রমে অধিদপ্তরের বিদ্যমান সেবাগুলোও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে উপকারভোগী শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে ডিলার নিয়োগ, পণ্য বিক্রি, লেনদেন ও নজরদারি—টিসিবির পুরো ব্যবস্থাপনা ধীরে ধীরে ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আসবে।
জি বাংলা ডেস্ক