সংসদে গঠনমূলক ভূমিকা রাখার কথা উল্লেখ করে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সরকার বিরোধী দলের পরামর্শ গ্রহণ না করলেও সংসদে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে কোনো সমস্যার সমাধান হবে না। ফাইল ছুড়ে ‘সিন ক্রিয়েট’ করা বা ওয়াকআউট করে বেরিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে জনগণের কাছে ফিরে গিয়ে তাদের সমস্যার কথা তুলে ধরাই বিরোধী দলের কাজ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘ফাইল ছুড়ে ওখানে একটা সিন ক্রিয়েট করা কিংবা ওয়াকআউট করে বের হয়ে আসায় কি সমস্যার সমাধান হবে? ফাইল ছুড়ে বা বিশৃঙ্খলা তৈরি করে তো লাভ নেই। তখন আমাদের কাজ হবে ভুক্তভোগী জনগণের কাছে ফিরে যাওয়া। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সংসদে আমরা ফাইল ছোড়ার মতো বিরোধী দল হব না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা স্পিকার গুম করার বিরুদ্ধে দল হব না। আমরা আনসিভিলাইজড কোনো কাজ করব না। জংলি কোনো কাজ করব না। আমরা যা করব এথিক্স, ল এবং হিউম্যানিটিকে ধারণ করব। আর যা করব জনগণের জন্য করব।’
সংসদে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার জন্য তাদের পক্ষ থেকে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান জামায়াত আমির। তেলের সংকট নিয়ে ৬২ বিধিতে আলোচনার জন্য নোটিশ দেওয়ার পর ৬৮ বিধিতে সংক্ষিপ্ত আলোচনার জন্য নোটিশ দিতে বলা হলে তারা তাতে সম্মত হন বলেও জানান তিনি। এরপর তাদের প্রস্তাবের পর প্রধানমন্ত্রী একটি সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের প্রস্তাব আনেন এবং সরকারি ও বিরোধী দলের পাঁচজন করে মোট ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।
শফিকুর রহমান বলেন, তিন দিনের মধ্যে বিষয়টি সমাধানের দিকে যায় এবং এ সময়ে বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি না হলেও মানুষের মধ্যে এক ধরনের আস্থা তৈরি হয়। সরকার ও বিরোধী দল বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে এবং যৌথ কমিটি গঠন করেছে—এতে মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া আতঙ্ক কমেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জামায়াত কৃত্রিমভাবে মানুষকে উসকে দিয়ে উত্তেজনা তৈরি করেছে—এমন বক্তব্যও নাকচ করেন শফিকুর রহমান। একই সঙ্গে সার, বিদ্যুৎ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, শিশু ধর্ষণ ও হত্যা এবং বাজারে পণ্যের উচ্চমূল্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাদের দেওয়া নোটিশ সংসদে আলোচনায় আনার ক্ষেত্রে সমস্যা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
দেশের শিল্প খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ জানান জামায়াত আমির। তিনি বলেন, উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেছে এবং তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন খাতে অর্ডার কমছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে গেলে এর নেতিবাচক প্রভাব দেশের অর্থনীতি ও সমাজে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, উৎপাদন কমে গেলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক টিকে থাকতে না পেরে শ্রমিক ছাঁটাই করতে বাধ্য হতে পারেন। কর্মসংস্থান হারানো শ্রমিকদের অনেকে অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারেন, কেউ হতাশায় আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে পারেন কিংবা ক্ষোভ থেকে মালিকের ওপর হামলা করতে পারেন বলেও আশঙ্কা জানান তিনি।
শিল্প খাতের সমস্যা সমাধানে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে বলে মন্তব্য করে শফিকুর রহমান জানান, জামায়াতের একটি কারিগরি বিশেষজ্ঞ দল রয়েছে। দেশে-বিদেশে কাজ করা অভিজ্ঞ অ্যাকাডেমিশিয়ান এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচ্চপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিদের নিয়ে এ দল গঠিত বলে জানান তিনি। সরকারের পক্ষ থেকে চাইলে ওই বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তবে সরকার তা গ্রহণ করেনি বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘এখন আমরা কি সরকারকে বাইপাস করে এই সমস্যার সমাধান বিরোধী দল করতে পারব? আমাদের হাতে সেরকম কিছু আছে? সুযোগ আছে কিনা, সুযোগও তো নাই। যা করবে সরকারকেই তো উদ্যোগ নিতে হবে।’
সরকার বিরোধী দলের পরামর্শ গ্রহণ না করলেও সংসদে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি সমাধান নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, তখন জনগণের কাছে গিয়ে বিষয়গুলো তুলে ধরাই বিরোধী দলের দায়িত্ব।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও সংসদ সদস্যদের আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে তার বিরোধিতা করার কথাও জানান জামায়াত আমির। তিনি বলেন, দেশের মানুষ যখন আর্থিক সংকটে রয়েছে, তখন সংসদ সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো উচিত নয়।
সরকারি প্লট ও ট্যাক্সমুক্ত গাড়ি না নেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে তারা এসব সুবিধা গ্রহণ না করার কথা বলেছিলেন এবং নির্বাচিত হওয়ার পর তা বাস্তবায়ন করেছেন। একই সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সরকারি দলকেও অভিনন্দন জানিয়েছেন বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমরা এইভাবে এই সংসদটাকে জনগণের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চাই। আমাদের কপাল-কিসমত গড়ার জন্য নয়। সরকারি দল হোক, বিরোধী দল হোক, সবাই বলেছেন আমি শাসক নই, সেবক হতে চাই। তো এখন শাসকের মানসিকতা থাকবে কেন? সেবকের মানসিকতা থাকবে।’
সাক্ষাৎকার ও গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রেও নিজের কিছু আপত্তির কথা জানান শফিকুর রহমান। তার অভিযোগ, বক্তব্যের অংশবিশেষ কেটে ফটোকার্ডে প্রকাশ করা হয়। এতে বক্তব্যের মূল অর্থ পরিবর্তিত হয়ে মানুষ বিভ্রান্ত হয় বলে দাবি করেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমি ইন্টারভিউতে যা বলি, ফটোকার্ডে তা আসে না। মিসলিডিং কাট, পিস লেজ নাই, মাথা নাই, মাঝখান থেকে শুধু পেট উঠাইয়ে দেওয়া হয়। মানে কি? এটার মাধ্যমে মানুষ কনফিউজড হয়।’
গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারের জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরির সুযোগ ছিল বলেও মন্তব্য করেন জামায়াত আমির। তবে সরকার তা না করে গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বলে দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে ঐক্য ছিল, বিএনপির কর্মকাণ্ডে তাতে ফাটল ধরেছে বলেও অভিযোগ করেন শফিকুর রহমান। এসব বক্তব্য তার রাজনৈতিক মূল্যায়ন হিসেবে এসেছে; এর স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি।
জি বাংলা ডেস্ক