একসময় গাছ থেকে ঝরে পড়া পচা সুপারি কৃষকের কাছে ছিল পুরোপুরি ফেলনা। গাছের নিচে পড়ে থেকে পচে যেত, কেউ কুড়িয়ে নেওয়ারও প্রয়োজন মনে করতেন না। সেই পচা সুপারিই এখন কুড়িগ্রামের রাজারহাটে হয়ে উঠেছে শিল্পের কাঁচামাল।
গাছতলা থেকে সংগ্রহ করে শুকানো, বাছাই ও প্রক্রিয়াজাতের পর এসব সুপারি চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে। এ ব্যবসাকে ঘিরে রাজারহাটের দিনোবাজারে গড়ে উঠেছে পচা সুপারির পাইকারি বাজার।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, দিনোবাজারে প্রতি মাসে প্রায় ৫০ টন পচা সুপারি কেনাবেচা হয়। সংগ্রহ, শুকানো, বাছাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন শতাধিক শ্রমিক। তাদের বড় একটি অংশ নারী।
গ্রামের বাড়ির আঙিনা কিংবা সুপারি বাগানের নিচে পড়ে থাকা পচা সুপারি এখন আর ফেলনা নয়। হকাররা এসব সুপারি কুড়িয়ে বস্তায় ভরে রোদে শুকিয়ে দিনোবাজারে নিয়ে আসেন। পরে ব্যবসায়ীরা সেগুলো কিনে বাছাই ও প্রক্রিয়াজাত করেন।
দিনোবাজারে নিয়মিত পচা সুপারি কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ১১ ব্যবসায়ী। মানভেদে প্রতি কেজি পচা সুপারি ৬০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত দামে কেনা হয়। পরিষ্কার, বাছাই ও শুকানোর পর তা ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পাঠানো হয়।
ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রক্রিয়াজাত এসব সুপারি বাণিজ্যিক রং প্রস্তুতকারী কারখানা ও অন্যান্য শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে যে সুপারি একসময় মাটিতে পড়ে নষ্ট হতো, সেটিই এখন স্থানীয়ভাবে অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করছে।
এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আয় করছেন স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষেরাও। দিনোবাজারে সুপারি শুকানো, বাছাই ও প্রক্রিয়াজাতের কাজে শতাধিক শ্রমিক কাজ করছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী।
সাগরিকা নামের এক শ্রমিক বলেন, আগে কাজের খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হতো। এখন বছরের প্রায় ছয় মাস এখানে নিয়মিত কাজ পান। প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় করতে পারছেন, যা সংসারের খরচে সহায়তা করছে।
ছাটবান্ধা এলাকার নারী শ্রমিক রেণুবালা বলেন, আগে বসে থাকতেন। এখন সুপারি বাছাই ও শুকানোর কাজ করে দিনে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা মজুরি পাচ্ছেন।
শ্রমিকদের পাশাপাশি পচা সুপারির ব্যবসা স্থানীয়ভাবে উদ্যোক্তাও তৈরি করেছে। ব্যবসায়ী সুজা মিয়া জানান, একসময় তিনি বেকার ছিলেন। পরে পচা সুপারি সংগ্রহ ও সরবরাহের ব্যবসায় যুক্ত হন। বছরের প্রায় ছয় মাস এ ব্যবসা চলে বলে জানান তিনি।
ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি প্রতি মাসে গড়ে ৫০ টন পচা সুপারি বিভিন্ন স্থানে পাঠান। এতে মাসে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা নিট লাভ থাকে।
আরেক ব্যবসায়ী লাভলু মিয়া বলেন, এই ব্যবসার মাধ্যমে তিনি নিজে আয় করার পাশাপাশি এলাকার প্রায় ১০০ শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পেরেছেন।
কুড়িগ্রামে সুপারি চাষেরও বিস্তৃত এলাকা রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় প্রায় ১ হাজার ২৬৫ হেক্টর জমিতে সুপারি বাগান রয়েছে। ফলে উৎপাদিত সুপারির পাশাপাশি ঝরে পড়া ও নষ্ট হয়ে যাওয়া সুপারি সংগ্রহ করে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।
তবে এ ব্যবসা এখনো অনেকটাই ব্যক্তি উদ্যোগনির্ভর। আধুনিক কোনো প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র নেই। অধিকাংশ সুপারি খোলা জায়গায় রোদে শুকিয়ে এবং হাতে বাছাই করে প্রস্তুত করা হয়।
ব্যবসায়ীদের দাবি, আধুনিক ড্রায়ার মেশিন, প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে এ খাত আরও সম্প্রসারিত হতে পারে। মানসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে দেশের বাইরেও বাজার তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজারহাট উপজেলা অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা হৈমন্তী রানী বলেন, যে সুপারি একসময় ফেলনা হিসেবে পড়ে থাকত, তা এখন কৃষকের বাড়তি আয়ের পথ তৈরি করেছে। এই প্রক্রিয়াজাত বাণিজ্যের সঙ্গে কৃষক, ব্যবসায়ী ও প্রান্তিক শ্রমিক—সবাই আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
তবে এ খাতকে আধুনিক ও সম্প্রসারিত করতে সরকারি কোনো নতুন পরিকল্পনা বা প্রকল্প রয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপাতত এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা বা প্রকল্প তাদের হাতে নেই।
রাজারহাটের দিনোবাজারে স্তূপ করে রাখা পচা সুপারি তাই শুধু একটি পণ্যের বেচাকেনার চিত্র নয়। গাছতলা থেকে কুড়িয়ে নেওয়া সেই সুপারি এখন শ্রমিকের আয়, ব্যবসায়ীর উদ্যোগ এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার উৎস হয়ে উঠেছে।
জি বাংলা ডেস্ক