ক্যানসার চিকিৎসায় পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ: বাংলাদেশের জন্য বাস্তবসম্মত পথ

আপলোড সময় : ০৫-১০-২০২৬ ১১:৩১:৫০ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ০৫-১০-২০২৬ ১১:৩১:৫০ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশের মতো বিপুল জনগোষ্ঠীর একটি দেশে শুধু সরকারের একার পক্ষে সবার জন্য মানসম্মত, সময়োপযোগী ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কঠিন। জনসংখ্যার চাপ, বিশেষায়িত জনবলের ঘাটতি, সীমিত অবকাঠামো এবং চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান ব্যয় আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। এই বাস্তবতায় সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে ভাবার সময় এসেছে।

এখানেই পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি (PPP) একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিকল্প হতে পারে। আমাদের দেশে পিপিপি নিয়ে আলোচনা হলে অনেক সময় ধারণা করা হয়, সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মিলে একটি নতুন হাসপাতাল তৈরি করবে। বাস্তবে এর পরিধি আরও বিস্তৃত। সরকার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা কিনতে পারে, সরকারি রোগীকে নির্ধারিত মূল্যে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে পারে, ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি যৌথভাবে ব্যবহার করতে পারে কিংবা সরকারি জমিতে বেসরকারি বিনিয়োগে বিশেষায়িত সেবা কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে।

একজন ক্যানসার বিশেষজ্ঞ হিসেবে ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে পিপিপির প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। ক্যানসার চিকিৎসা অত্যন্ত প্রযুক্তিনির্ভর, ব্যয়বহুল ও বহুমাত্রিক। একজন রোগীর জন্য সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, প্যাথলজি, ইমেজিং, মলিকিউলার টেস্টিং, নিউক্লিয়ার মেডিসিন ও প্যালিয়েটিভ কেয়ারের মতো একাধিক সেবার প্রয়োজন হতে পারে।

বিশেষ করে রেডিওথেরাপি সেবা চালু করতে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন। শুধু একটি মেশিন কিনলেই হয় না। প্রয়োজন উপযুক্ত বাঙ্কার, ট্রিটমেন্ট প্ল্যানিং সিস্টেম, কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স, প্রশিক্ষিত রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, মেডিকেল ফিজিসিস্ট, রেডিয়েশন থেরাপি টেকনোলজিস্ট এবং দক্ষ প্রকৌশল সহায়তা। একই কথা পিইটি-সিটি, ব্র্যাকিথেরাপি কিংবা আধুনিক মলিকিউলার ডায়াগনস্টিকসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

তাই প্রশ্ন হলো, দেশে যদি বেসরকারি খাতে ইতোমধ্যে কার্যকর রেডিওথেরাপি মেশিন, পিইটি-সিটি, ব্র্যাকিথেরাপি বা উন্নত প্যাথলজি সেবা থাকে, তাহলে সেই সক্ষমতাকে জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না কেন?

নতুন সরকারি ক্যানসার সেন্টার অবশ্যই প্রয়োজন। তবে নতুন অবকাঠামো তৈরি, যন্ত্রপাতি স্থাপন, জনবল নিয়োগ এবং পূর্ণ সক্ষমতায় সেবা চালু করতে সময় লাগে। ক্যানসারের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসায় দীর্ঘ বিলম্ব রোগের অগ্রগতি এবং চিকিৎসার ফলাফলকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে সরকার চাইলে নির্দিষ্ট কিছু ক্যানসার সেবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে কিনতে পারে। উদাহরণ হিসেবে, সরকারি হাসপাতালে রেডিওথেরাপির অপেক্ষার সময় বেশি হলে নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণকারী বেসরকারি কেন্দ্রে রোগী পাঠানো যেতে পারে। এর জন্য জাতীয়ভাবে নির্ধারিত প্যাকেজ মূল্য থাকতে পারে। দরিদ্র রোগীর ক্ষেত্রে সরকার পুরো ব্যয় বহন করতে পারে। অন্য রোগীদের ক্ষেত্রে কো-পেমেন্ট বা স্বাস্থ্যবিমা যুক্ত করা যেতে পারে।

এ ধরনের মডেলের কয়েকটি সম্ভাব্য রূপ হতে পারে। প্রথমত, ‘সার্ভিস পারচেজ মডেল’, যেখানে সরকার বেসরকারি হাসপাতাল থেকে নির্দিষ্ট সেবা কিনবে। দ্বিতীয়ত, ‘পেশেন্ট ভাউচার মডেল’, যেখানে রোগী সরকারি ভাউচার নিয়ে অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে পারবেন। তৃতীয়ত, ‘কো-পেমেন্ট মডেল’, যেখানে সরকার ও রোগী যৌথভাবে ব্যয় বহন করবেন। চতুর্থত, ‘ইকুইপমেন্ট পার্টনারশিপ মডেল’, যেখানে বেসরকারি বিনিয়োগে ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হলেও নির্দিষ্টসংখ্যক সরকারি রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে। পঞ্চমত, ‘বিল্ড-অপারেট-ট্রান্সফার মডেল’, যেখানে বেসরকারি খাত একটি বিশেষায়িত কেন্দ্র তৈরি ও পরিচালনা করবে এবং নির্দিষ্ট সময় পর তা সরকারের কাছে হস্তান্তর করবে।

তবে পিপিপি কার্যকর করতে হলে শক্তিশালী নজরদারি অপরিহার্য। এটি যেন শুধু বেসরকারি ব্যবসার সুযোগে পরিণত না হয়। চিকিৎসার মূল্য, রোগী নির্বাচনের নীতি, সেবার মান, অপেক্ষার সময়, নিরাপত্তা এবং চিকিৎসার ফলাফল নিয়মিত অডিট করতে হবে। কোন প্রতিষ্ঠান কতজন রোগী চিকিৎসা করছে, কী মানের চিকিৎসা দিচ্ছে এবং সরকারি অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না—তার স্বচ্ছ হিসাব থাকতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আলোচনাকে ‘সরকারি বনাম বেসরকারি’ বিতর্কে সীমাবদ্ধ না রাখা। সরকারের শক্তি হলো নীতি নির্ধারণ, জনস্বার্থ রক্ষা, ভর্তুকি প্রদান এবং বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের শক্তি হলো দ্রুত বিনিয়োগ, প্রযুক্তি গ্রহণ, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং তুলনামূলক দ্রুত সেবা প্রদান।

বাংলাদেশে একসঙ্গে বড় আকারে পিপিপি চালুর প্রয়োজন নেই। বরং রেডিওথেরাপি, পিইটি-সিটি, ব্র্যাকিথেরাপি বা নির্বাচিত ক্যানসার ডায়াগনস্টিক সেবা দিয়ে কয়েকটি পাইলট প্রকল্প শুরু করা যেতে পারে। ছয় মাস বা এক বছর পর অপেক্ষার সময়, ব্যয়-সাশ্রয়িতা, রোগীর সন্তুষ্টি ও চিকিৎসার ফলাফল মূল্যায়ন করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।

শেষ পর্যন্ত রোগী সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেন নাকি বেসরকারি হাসপাতালে, সেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—তিনি সময়মতো, নিরাপদ, মানসম্মত ও আর্থিকভাবে সহনীয় চিকিৎসা পেলেন কি না।

এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে স্বচ্ছ, নিয়ন্ত্রিত ও রোগীকেন্দ্রিক পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বাংলাদেশের ক্যানসার চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানোর একটি বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে।

ডা. আরমান রেজা চৌধুরী
ক্যানসার বিশেষজ্ঞ
এভারকেয়ার হাসপাতাল, ঢাকা

সম্পাদকীয় :

সম্পাদক: শাকিলা জাহান
মোবাইল: ০১৩০১১০৪০৭০ ই-মেইল: info@gbanglanews.com

অফিস :

জি.এম বাংলা লিমিটেডের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান।

৫৬-৫৭, শরীফ ম্যানশন, মতিঝিল রোড, ঢাকা-১০০০