বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে শরীর। রোগ-শোকে হারিয়ে গেছে স্বাভাবিক চলাফেরার শক্তি। ঘরের ভেতর কয়েক কদম হাঁটতেও এখন লাঠিই ভরসা। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সন্তানহীন ভবেশ চন্দ্র রায় ও নিরু রানী রায়ের দিন কাটছে অভাব, অসুস্থতা ও অনিশ্চয়তায়।
দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার ৬ নম্বর রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের ঈশানপুর গ্রামের এই দম্পতির দুজনেই অসুস্থ। লাঠিতে ভর দিয়ে কোনো রকমে ঘরের ভেতর চলাফেরা করতে পারলেও বাইরে গিয়ে কাজ করে আয় করার মতো শারীরিক সক্ষমতা নেই তাঁদের। ফলে দুবেলা খাবারের ব্যবস্থা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সংসারের চাকা সচল রাখতে বাড়ির ছোট উঠানে সামান্য শাকসবজি চাষ করেন তাঁরা। গাছ থেকে সবজি তুলে আনেন নিরু রানী। আর অসুস্থ ভবেশ চন্দ্র কাঁপা হাতে দাঁড়িপাল্লায় মেপে সেই সবজি স্থানীয় মানুষের কাছে বিক্রির জন্য দেন। সবজি বিক্রি করে যে সামান্য অর্থ আসে, তা দিয়ে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ তো দূরের কথা, ঠিকমতো চাল কেনাও সম্ভব হয় না।
অভাবের সংসারে কখনো পাড়া-প্রতিবেশীরা তাঁদের পাশে দাঁড়ান। কেউ খাবার দেন, কেউ দেন প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস। এতে কোনো কোনো দিন খাবারের ব্যবস্থা হলেও দীর্ঘদিনের অভাব ঘোচানোর মতো স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেই।
শুধু খাবারের কষ্ট নয়, তাঁদের বসবাসের অবস্থাও করুণ। কষ্ট করে জমানো টাকা দিয়ে কোনো রকমে ঘর মেরামত করলেও একই ঘরে গরু রাখতে হয়। পাশে মাটির মেঝেতে বসবাস করেন তাঁরা। অসুস্থ শরীর নিয়েই প্রতিদিন এমন পরিবেশে দিন-রাত কাটছে এই বৃদ্ধ দম্পতির।
ভবেশ চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমরা খুব কষ্ট করে দিন কাটাই। পাড়ার মানুষজন খাবার দিয়ে গেলে খেতে পারি, না হলে অনেক সময় অনাহারেও দিন কাটাতে হয়।’
নিরু রানী রায় বলেন, ‘অসুস্থতার কারণে অনেকদিন ধরে কাজ করতে পারি না। এখন ঘরে খাবারও নেই। কীভাবে দিন চলবে, তার কোনো বুদ্ধি পাচ্ছি না। অনেক কষ্ট করে দিন কাটাচ্ছি।’
স্থানীয় বাসিন্দা আরতি রানী বলেন, তাঁরা কোনো কাজ করতে পারেন না। সন্তানও নেই। স্থানীয়রা খাবার দিয়ে সহায়তা না করলে অনেক সময় তাঁদের না খেয়ে থাকতে হয়।
আরেক বাসিন্দা দীনেশ বলেন, আগে শারীরিকভাবে সুস্থ থাকায় ভবেশ ও নিরু মানুষের বাড়িতে কাজ করতেন। এখন দুজনই অসুস্থ হয়ে পড়ায় আর কাজ করতে পারেন না। তাঁদের অবস্থা খুবই খারাপ।
স্থানীয় সংবাদদাতা রশিদুল ইসলাম বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই দম্পতির দুর্দশার কথা জানতে পেরে তিনি তাঁদের এক মাসের বাজার খরচ দিয়েছেন। সরকারি ভাতা বা সহায়তার আওতায় তাঁদের আনার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।
৬ নম্বর রামচন্দ্রপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমান বলেন, কয়েকদিন আগে তিনি ওই দম্পতিকে এক বস্তা চাল দিয়ে এসেছেন। সরকারি সুযোগ-সুবিধা এলে তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া হবে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্যকে তাঁদের বিষয়ে জানানো হয়েছে। বয়স্ক ভাতার কার্ড বরাদ্দ হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাঁদের কার্ড দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।