বলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পাটেকার আর নেই। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে গোয়ার ডোনা পাওলায় নিজ বাসভবনে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ৭৫ বছর বয়সে মারা যান তিনি। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট সিপিআর দিয়ে তাকে বাঁচাতে পারেননি।
নানা পাটেকারের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার দীর্ঘ অভিনয়জীবনের নানা চরিত্র নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘আব তক ছাপ্পান’সহ গম্ভীর ও শক্তিশালী চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত। তবে নতুন প্রজন্মের অনেক দর্শকের কাছে নানা পাটেকারের পরিচয়ের শুরুটা এসব চরিত্র দিয়ে নয়; বরং ২০০৭ সালের ‘ওয়েলকাম’ সিনেমার উদয় শেঠি চরিত্র দিয়ে।
২০০৭ সালের ২১ ডিসেম্বর মুক্তি পাওয়া ‘ওয়েলকাম’ পরিচালনা করেন আনিস বাজমি। এতে নানা পাটেকারের সঙ্গে অভিনয় করেন অনিল কাপুর, অক্ষয় কুমার, ক্যাটরিনা কাইফ ও পরেশ রাওয়াল। সিনেমায় নানা অভিনয় করেন দুবাইভিত্তিক গ্যাংস্টার উদয় শেঠির চরিত্রে।
গল্পে উদয় শেঠির প্রধান চিন্তা তার বোন সঞ্জনার বিয়ে। কিন্তু অপরাধী পরিবারের সঙ্গে কেউ সম্পর্ক করতে রাজি নয়। উদয়ের সহযোগী মজনু ভাইয়ের সহায়তায় শেষ পর্যন্ত রাজীব নামের এক যুবকের সঙ্গে সঞ্জনার সম্পর্ক তৈরি হয়। তবে রাজীবের মামা ড. ঘুংরু শর্ত দেন, উদয় ও মজনুকে অপরাধের জগৎ ছাড়তে হবে।
এরপর গল্পে আসে উদয় ও মজনুর জীবনের বড় পরিবর্তন। তারা অপরাধের বদলে অভিনয় ও শিল্পচর্চায় যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে। আর একজন ভয়ংকর গ্যাংস্টারের এই নতুন পরিচয় নিয়েই তৈরি হয় সিনেমার বড় অংশের হাস্যরস।
উদয় শেঠির চরিত্রটি নানা পাটেকারের জন্য ছিল ব্যতিক্রমী। এর আগে ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’ ও ‘আব তক ছাপ্পান’-এর মতো সিনেমায় তার গম্ভীর ও কঠিন অভিনয় দর্শককে মুগ্ধ করেছিল। সেই অভিনেতাকে এবার একজন হাস্যরসাত্মক গ্যাংস্টারের চরিত্রে নেওয়া ছিল নির্মাতাদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি।
পরিচালক আনিস বাজমি পরে জানিয়েছিলেন, শুরুতে নানা পাটেকার চিত্রনাট্য শুনতেও আগ্রহী ছিলেন না। দীর্ঘ সময় ধরে চিত্রনাট্য শোনানোর পর তিনি চরিত্রটি করার বিষয়ে রাজি হন। মজনু ভাই চরিত্রটির নামও অনিল কাপুরের প্রস্তাবিত বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
উদয় শেঠি চরিত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তার গম্ভীর অভিনয়। নানা পাটেকার চরিত্রটিকে কখনো সরাসরি কৌতুকের বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করেননি। বরং উদয় নিজেকে সত্যিকারের ভয়ংকর মানুষ মনে করছে—এমনভাবেই অভিনয় করেছেন। কিন্তু তার চারপাশের পরিস্থিতি এতটাই হাস্যকর যে তার গম্ভীরতা থেকেই তৈরি হয়েছে হাসির মুহূর্ত।
‘কন্ট্রোল উদয়’ সংলাপটি পরে সিনেমা ছাড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মিম সংস্কৃতির অংশ হয়ে যায়। উদয়ের রাগ, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা এবং নানা পাটেকারের মুখভঙ্গি—সব মিলিয়ে সংলাপটি নতুন প্রজন্মের কাছে আলাদা জনপ্রিয়তা পায়।
রিলস, স্টোরি ও মিমে সংক্ষিপ্ত সংলাপ সহজেই ব্যবহার করা যায়। তাই ‘কন্ট্রোল উদয়’-এর মতো সংলাপ সিনেমার পুরো গল্প না জেনেও ব্যবহার করতে পারেন দর্শকেরা। পরীক্ষা, পারিবারিক অনুষ্ঠান, বন্ধুদের আড্ডা কিংবা যানজট—বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নিজের বিরক্তি বা রাগ বোঝাতেও এটি ব্যবহার করা হয়।
উদয় চরিত্রের আরেকটি দিকও দর্শকদের আকৃষ্ট করেছে। সে একজন গ্যাংস্টার হলেও বোনকে নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। তার ইচ্ছা, বোনের ভালো ঘরে বিয়ে হোক। একই সঙ্গে সে অভিনেতা হওয়ার স্বপ্নও দেখে। একজন কঠিন মানুষের এই কোমল দিক চরিত্রটিকে আরও মানবিক করে তুলেছে।
উদয় ও মজনুর বন্ধুত্বও ‘ওয়েলকাম’-এর অন্যতম আকর্ষণ। দুজনের মধ্যে ঝগড়া, ভয়, বিপদে একে অন্যকে সামলে নেওয়া—সব মিলিয়ে তাদের জুটি দর্শকের কাছে জনপ্রিয় হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বন্ধুত্বের নানা মজার পরিস্থিতিতে উদয়-মজনুর নাম ব্যবহার করতে দেখা যায়।
‘ওয়েলকাম’ মুক্তির পর নানা পাটেকারের অভিনয় ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। পরবর্তী সময়ে ‘ওয়েলকাম ব্যাক’-এও ফিরে আসে উদয় শেঠি চরিত্র। ফলে নানা পাটেকারের দীর্ঘ অভিনয়জীবনের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছেও চরিত্রটি টিকে থাকে।
নানা পাটেকারের অভিনয়ের বিশেষত্ব ছিল তার কণ্ঠ, চোখের দৃষ্টি, সংলাপ বলার ধরন এবং নিয়ন্ত্রিত অভিব্যক্তি। গম্ভীর চরিত্রে যে বৈশিষ্ট্যগুলো তাকে শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, ‘ওয়েলকাম’-এ একই বৈশিষ্ট্যই হয়ে উঠেছিল হাসির উৎস।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নানা পাটেকার অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্র উপহার দিয়েছেন। তবে নতুন প্রজন্মের অনেক দর্শকের কাছে তিনি হয়তো বিশেষভাবে মনে থাকবেন সেই উদয় শেঠি হিসেবেই—যে নিজের রাগ সামলাতে নিজেকেই বলে, ‘কন্ট্রোল উদয়!’