নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) ইউনিফর্ম তৈরিতে অর্থায়ন ও এ-সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে সংগঠনটির প্রধান নাথান বমসহ নয়জনের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
সিআইডির অনুসন্ধানে কেএনএফের ৪০ হাজার সেট চার রঙের ক্যামোফ্লেজ ইউনিফর্ম তৈরির ফ্যাব্রিক ও সেলাইয়ের কাজে মোট ১ কোটি ৬২ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) বায়েজিদ বোস্তামী থানায় মামলাটি করা হয়। এতে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ধারা উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় নাথান বম, মংহলাসিন মারমা ওরফে মং, নিয়াজ হায়দার, মো. গোলাম আজম, সাহেদুল ইসলাম, মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, জামালুল ইসলাম, মো. তৌহিদুল ইসলাম ও মো. মতিউর রহমানকে আসামি করা হয়েছে।
সিআইডি জানায়, ২০২৫ সালের ১৮ মে রাত আড়াইটার দিকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) একটি বিশেষ দল বায়েজিদ বোস্তামী থানার মোজাফফরনগর আবাসিক এলাকায় অভিযান চালিয়ে কেএনএফের পোশাক তৈরির সঙ্গে জড়িত একজনকে আটক করে। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হালিশহরের ছোটপুল এলাকার দুটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে আরও দুজনকে আটক করা হয়।
তাদের দেওয়া তথ্য যাচাই করে বায়েজিদ বোস্তামী থানার একটি গোডাউন ও একটি গার্মেন্টস কারখানা থেকে ২০ হাজার ৩০০ সেট চার রঙের ক্যামোফ্লেজ ইউনিফর্ম উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে গোডাউন থেকে ১১ হাজার ২০০ সেট এবং কারখানা থেকে ৯ হাজার ১০০ সেট ইউনিফর্ম জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে বায়েজিদ বোস্তামী থানায় মামলা করা হয়।
পরে কেএনএফের ইউনিফর্ম তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে সিআইডি। ব্যাংক হিসাব, চেক, নগদ অর্থ প্রদান, ক্রয়াদেশ, ব্যবসায়িক পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও লেনদেন বিশ্লেষণ করে অর্থের উৎস ও প্রবাহের তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
সিআইডির দাবি, কেএনএফের প্রতিনিধি হিসেবে মংহলাসিন মারমা প্রথমে নিয়াজ হায়দারের সঙ্গে এবং পরে তার মাধ্যমে গোলাম আজমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর ওয়েল কম্পোজিট নিট লিমিটেডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কেএনএফের ইউনিফর্মের ক্যামোফ্লেজ প্রিন্টের ফ্যাব্রিক তৈরির ব্যবস্থা করা হয়।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মংহলাসিন মারমা নিজেকে এমআই এন্টারপ্রাইজের সহকারী কমার্শিয়াল ম্যানেজার পরিচয় দিয়ে ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর ও ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দুটি পারচেজ অর্ডার দেন। এসব কাজের বিপরীতে ওয়েল কম্পোজিট নিট লিমিটেডকে ৯০ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ৪০ হাজার সেট ইউনিফর্মের শার্ট ও প্যান্ট সেলাইয়ের জন্য রিংভো অ্যাপারেলস, এনএন ফ্যাশন ও নূর ফ্যাশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। সেলাইয়ের কাজের জন্য এসব প্রতিষ্ঠানকে ৭২ লাখ টাকা দেওয়া হয় বলে সিআইডি জানিয়েছে।
সিআইডির ভাষ্য, কেএনএফের ইউনিফর্ম তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় ব্যাংক হিসাব, চেক ও নগদ অর্থের মাধ্যমে মোট ১ কোটি ৬২ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৯০ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা ফ্যাব্রিক তৈরিতে এবং ৭২ লাখ টাকা ইউনিফর্ম সেলাইয়ে ব্যয় করা হয়েছে।
সিআইডি বলছে, নথিপত্র ও সাক্ষীদের বক্তব্য পর্যালোচনায় কেএনএফের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নাথান বমের নির্দেশনায় মংহলাসিন মারমাসহ অন্য আসামিরা সংগঠনটির জন্য বিপুল পরিমাণ ইউনিফর্ম তৈরির উদ্যোগ ও অর্থায়নে জড়িত ছিলেন—এমন অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। এসব ইউনিফর্ম তৈরিতে অর্থের হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে অর্থের প্রকৃত উৎস গোপনের চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
মামলাটির তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। কেএনএফের সন্ত্রাসী কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য অর্থের উৎস ও প্রবাহ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ও অন্যান্য আর্থিক লেনদেন এবং এ আর্থিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত অন্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা শনাক্তে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।