জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণকেন্দ্র থেকে প্রতিবাদের মঞ্চ, জন্তর মন্তরের ইতিহাস
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির জন্তর মন্তর—একসময় যেখানে আকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হতো, আজ সেটিই রাজনৈতিক অসন্তোষ, সামাজিক দাবি ও গণআন্দোলনের পরিচিত মঞ্চ। ১৭২৪ সালে মহারাজা সওয়াই জয় সিংয়ের উদ্যোগে নির্মিত এই ঐতিহাসিক জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণকেন্দ্র সময়ের সঙ্গে পেয়েছে ভিন্ন তাৎপর্য। এর স্থাপত্যে যেমন বিজ্ঞানের ইতিহাস সংরক্ষিত, তেমনি আশপাশের সড়ক ও উন্মুক্ত পরিসর ধারণ করেছে ভারতের স্বাধীনতা-পরবর্তী নানা আন্দোলনের স্মৃতি।
২০২৬ সালে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির আন্দোলন জন্তর মন্তরকে আবার আলোচনায় এনেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ পরে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে বৃহত্তর প্রতিবাদে রূপ নেয়। জুনে দিল্লিতে আন্দোলনকারীদের সমাবেশের মধ্য দিয়ে বিষয়টি জাতীয় আলোচনায় আসে। তরুণদের ক্ষোভ কীভাবে অনলাইন পরিসর ছাড়িয়ে রাজপথে পৌঁছাতে পারে, এই আন্দোলন তার একটি উদাহরণ।
তবে জন্তর মন্তরের গুরুত্ব কোনো একটি আন্দোলনে সীমাবদ্ধ নয়। কয়েক দশক ধরে কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী, নারী, সাবেক সেনাসদস্য, ক্রীড়াবিদ, শিক্ষক, চিকিৎসক ও বিভিন্ন পেশার মানুষ নিজেদের দাবি জানাতে এখানে জড়ো হয়েছেন। কারও দাবি ন্যায্য মজুরি ও কৃষিনীতি নিয়ে, কারও প্রতিবাদ দুর্নীতি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে; আবার কেউ এসেছেন নাগরিক অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার কিংবা ব্যক্তিগত ক্ষতির প্রতিকার চাইতে। এভাবে জায়গাটি ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার এক উন্মুক্ত সংগ্রহশালায় পরিণত হয়েছে।
প্রতিবাদের ভূগোলের বদল
জন্তর মন্তর কীভাবে প্রতিবাদের কেন্দ্রে পরিণত হলো, তা বুঝতে হলে দিল্লির পুরোনো প্রতিবাদস্থলগুলোর ইতিহাসে ফিরে যেতে হয়। একসময় রাজপথের কাছে বোট ক্লাব এলাকায় বড় বড় সমাবেশ হতো। সেখানে কৃষকনেতা মহেন্দ্র সিং টিকাইতের নেতৃত্বে ১৯৮৮ সালের কৃষক আন্দোলন বিপুল জনসমাগম ঘটিয়েছিল। এমন সমাবেশের পর রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি নতুন করে সামনে আসে।
পরবর্তী সময়ে প্রতিবাদের স্থান ও পরিসর নিয়ে প্রশাসনিক বিধিনিষেধ বাড়তে থাকে। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে বোট ক্লাব এলাকায় বড় সমাবেশ সীমিত করার উদ্যোগের পর জন্তর মন্তর প্রতিবাদের বিকল্প স্থান হিসেবে গুরুত্ব পায়। সংসদ ভবনের কাছাকাছি হওয়ায় এখানে অবস্থান কর্মসূচি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ; আবার জায়গাটির আয়তন ও সড়কের বিন্যাসের কারণে বড় জমায়েত নিয়ন্ত্রণ করাও তুলনামূলক সহজ। ফলে প্রতিবাদের সুযোগ ও তার ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ—দুই বাস্তবতাই এই স্থানের পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।
২০০৬ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে জন্তর মন্তরে প্রতিবাদ কর্মসূচির ব্যাপকতা সম্পর্কে দিল্লি পুলিশের নথির উল্লেখ পাওয়া যায়। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পুষ্পাঞ্জলি ঝার গবেষণাপত্রে উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১০ সালের আগস্ট পর্যন্ত সেখানে ১৩ হাজার ১১৮টি ধর্না এবং ৫ হাজার ৪৯১টি বিক্ষোভ, সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০১০ সালের প্রথম আট মাসে প্রায় দেড় লাখ মানুষ এসব কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং আইন ভঙ্গের অভিযোগে ১২ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয় বলে ওই গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে। পরিসংখ্যানগুলো জন্তর মন্তরের প্রতিবাদস্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ব্যাপ্তি তুলে ধরে।
আন্দোলনের স্মৃতি ও জনতার দাবি
বিভিন্ন সময়ে জন্তর মন্তরে অনুষ্ঠিত আন্দোলন ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের কর্মসূচি থেকে শুরু করে ২০১১ সালে আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন—বিভিন্ন দাবি এখানে জনসমক্ষে এসেছে। ২০১২ সালে দিল্লিতে এক তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পর দেশজুড়ে যে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে, তারও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল এই এলাকা। ২০১৫ সালে সাবেক সেনাসদস্যদের ‘এক পদ, এক পেনশন’ দাবির আন্দোলন এবং ২০১৭ সালে তামিলনাড়ুর খরাপীড়িত কৃষকদের প্রতিবাদও জন্তর মন্তরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে।
এসব আন্দোলনের ধরন এক নয়, দাবিও এক নয়। কিন্তু একটি জায়গায় তাদের মিল—প্রচলিত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার কাছে নিজেদের বক্তব্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য জনসমক্ষে উপস্থিত হওয়ার চেষ্টা। সংসদের কাছাকাছি অবস্থান করায় প্রতিবাদকারীদের কাছে জন্তর মন্তর শুধু ভৌগোলিক স্থান নয়; এটি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ, সংবাদমাধ্যমে উপস্থিতি এবং বৃহত্তর জনমত গঠনেরও একটি মাধ্যম।
তবে প্রতিবাদের অধিকার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকারের মধ্যে টানাপোড়েনও তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ অবস্থান কর্মসূচি, অস্থায়ী তাঁবু, মাইক, বর্জ্য ও যান চলাচলের সমস্যার অভিযোগে এলাকাটির বাসিন্দারা আদালতের দ্বারস্থ হন। ২০১৭ সালে ভারতের জাতীয় পরিবেশ আদালত (এনজিটি) জন্তর মন্তর এলাকায় বিক্ষোভ বন্ধ করে অন্যত্র সরানোর নির্দেশ দেয়। পরে ২০১৮ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সাংবিধানিক অধিকার এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের অধিকার—দুটির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে।
পাথরের স্থাপত্যে আকাশের হিসাব
জন্তর মন্তরের আরেক পরিচয় এর বৈজ্ঞানিক স্থাপত্য। মহারাজা সওয়াই জয় সিং জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণ ও সময় নির্ণয়ের জন্য যে স্থাপনাগুলো নির্মাণ করেছিলেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে সম্রাট যন্ত্র ও জয়প্রকাশ যন্ত্র। এগুলো সাধারণ ভবন নয়; বরং নির্দিষ্ট জ্যামিতিক নকশায় তৈরি পর্যবেক্ষণ-উপকরণ। সূর্যের অবস্থান, সময় এবং আকাশের বিভিন্ন বস্তুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের কাজে এসব স্থাপনা ব্যবহৃত হতো।
সম্রাট যন্ত্রের বিশাল ত্রিভুজাকার কাঠামো সূর্যের ছায়ার সাহায্যে সময় নির্ণয়ে ব্যবহৃত হতো। অন্যদিকে জয়প্রকাশ যন্ত্রের অবতল পৃষ্ঠ ও তাতে চিহ্নিত রেখা আকাশের অবস্থান পর্যবেক্ষণে সহায়তা করত। পাথর ও ইটের স্থাপত্যকে ব্যবহারিক বিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত করার এই পদ্ধতি জন্তর মন্তরকে ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
স্থাপনাগুলো কেবল অতীতের জ্যোতির্বিজ্ঞানের নিদর্শন নয়; এগুলো দেখায়, আধুনিক যন্ত্রের ব্যাপক ব্যবহারের আগেও পর্যবেক্ষণ, গণনা ও জ্যামিতিক নকশার সমন্বয়ে জটিল বৈজ্ঞানিক কাজ করা সম্ভব ছিল। স্থাপত্যের ইতিহাস নিয়ে গবেষকেরা জন্তর মন্তরকে এ কারণে একটি পরীক্ষাগারসদৃশ পরিসর হিসেবেও বিবেচনা করেন।
একই জায়গায় বিজ্ঞান, স্মৃতি ও রাজনীতি
জন্তর মন্তরের ইতিহাসকে শুধু জ্যোতির্বিজ্ঞানের স্থাপত্য কিংবা প্রতিবাদস্থলের ইতিহাস হিসেবে আলাদা করে দেখা কঠিন। এখানে একদিকে রয়েছে জয় সিংয়ের বৈজ্ঞানিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার নিদর্শন, অন্যদিকে আধুনিক ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক দাবিদাওয়ার দীর্ঘ ধারাবাহিকতা। জায়গাটির পরিচয় গড়ে উঠেছে এই দুই ইতিহাসের পাশাপাশি চলার মধ্য দিয়ে।
লেখক সালমান রুশদির সঙ্গে জন্তর মন্তর নিয়ে আলোকচিত্রের কাজের সম্পর্কের উল্লেখও এই স্থানের সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গের অংশ। আলোকচিত্রী সিমন শাপুতের কাজের মধ্য দিয়ে জায়গাটির স্থাপত্য ও পরিবেশকে দেখার যে দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে, তা জন্তর মন্তরকে কেবল পর্যটনস্থল হিসেবে নয়, মানুষের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি ধারণকারী স্থান হিসেবেও তুলে ধরে। এ ছাড়া পল লুন্ডের Jaisingh and the Jantar Mantar, ব্যারি পারলুসের Celestial Mirror: The Astronomical Observatories of Jai Singh এবং অনীশা শেখর মুখার্জির Jantar Mantar: Maharaja Sawai Jai Singh’s Laboratory in Delhi—এ ধরনের গ্রন্থে এর বৈজ্ঞানিক ও স্থাপত্যগত গুরুত্ব আলোচিত হয়েছে।
শহর নিয়ে ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক অঁরি লেফেভরের ‘শহরের অধিকার’ ধারণার আলোকে জন্তর মন্তরকে দেখলে এর আরেকটি মাত্রা সামনে আসে। শহর শুধু ভবন, রাস্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সমষ্টি নয়; নাগরিকেরা কীভাবে সেখানে জড়ো হবেন, নিজেদের বক্তব্য জানাবেন এবং জনপরিসর ব্যবহার করবেন, সেটিও শহুরে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জন্তর মন্তরের ইতিহাসে এই প্রশ্ন বারবার ফিরে এসেছে।
আজকের তরুণদের আন্দোলন সেই দীর্ঘ ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় যোগ করেছে। প্রতিবাদের ভাষা, প্রতীক ও যোগাযোগের মাধ্যম বদলেছে; কিন্তু জনসমক্ষে দাবি জানানোর প্রয়োজন শেষ হয়নি। আকাশের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য নির্মিত জন্তর মন্তর তাই সময়ের সঙ্গে মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণেরও এক প্রতীকী পরিসরে পরিণত হয়েছে।