আদালতকক্ষ ভর্তি মানুষ। বিচারকের হাতে কলম। সেই কলমে লেখা হচ্ছে একজন মানুষের মৃত্যুদণ্ডের রায়। লেখা শেষ হতেই বিচারক ভেঙে ফেললেন কলমের নিব। সিনেমা কিংবা টেলিভিশন সিরিজে এমন দৃশ্য অনেকেই দেখেছেন। কিন্তু কখনো কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, মৃত্যুদণ্ডের রায় লেখার পর বিচারক কেন কলমের নিব ভেঙে ফেলেন?
এর পেছনে কয়েকটি প্রচলিত ব্যাখ্যা রয়েছে। তবে শুরুতেই বলে রাখা প্রয়োজন, কলমের নিব ভেঙে ফেলা কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা নয়। এটি মূলত একটি প্রতীকী রীতি হিসেবে পরিচিত। ব্রিটিশ আমল থেকে এ প্রথা চলে আসার কথা বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ করা হলেও এর সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক উৎপত্তি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সীমিত।
যে কলমে মৃত্যুদণ্ডের রায়, তা আর নয়
প্রচলিত একটি ব্যাখ্যা হলো, যে কলম দিয়ে একজন মানুষের মৃত্যুদণ্ডের রায় লেখা হয়েছে, সেই কলম দিয়ে যেন আর কারও জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত লেখা না হয়। একজন মানুষের মৃত্যুর নির্দেশ লিখে কলমের নিব ভেঙে ফেলার মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্তটির চূড়ান্ততাকে প্রতীকীভাবে তুলে ধরা হয়।
বিচারকের মনেও কি কাজ করে অনুশোচনা?
মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া বিচারকের জন্য অত্যন্ত গুরুতর দায়িত্বের বিষয়। অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় সর্বোচ্চ শাস্তি প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের পরিণতি যে একজন মানুষের মৃত্যু, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রচলিত আরেকটি ব্যাখ্যায় বলা হয়, কলমের নিব ভেঙে ফেলার মধ্য দিয়ে বিচারকের মানসিক ভার ও বিষণ্ণতার প্রতিফলন ঘটে। অর্থাৎ, দায়িত্ব পালন করলেও একজন মানুষের মৃত্যুর সিদ্ধান্ত যে সাধারণ কোনো বিষয় নয়, তা প্রতীকীভাবে প্রকাশ করা হয়।
রায় লেখার পর কি আর ফেরার পথ থাকে না?
আরেকটি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়ার পর কলমের নিব ভেঙে ফেলা হয় সিদ্ধান্তটির চূড়ান্ততার প্রতীক হিসেবে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়, বিচারক তাঁর দায়িত্ব অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।
তবে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পরও আইন অনুযায়ী আপিল, রায় পুনর্বিবেচনা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ক্ষমা প্রার্থনার সুযোগ থাকতে পারে। কলমের নিব ভাঙার অর্থ এসব আইনি পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়।
আইনে কি এমন কোনো নির্দেশ আছে?
না। মৃত্যুদণ্ডের রায় লেখার পর বিচারককে কলমের নিব ভাঙতেই হবে—এমন কোনো সাধারণ আইনগত বিধান নেই। এটি বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতীকী রীতি হিসেবে পরিচিত। এর পেছনে প্রচলিত ব্যাখ্যাগুলো রীতিটির তাৎপর্য বোঝানোর চেষ্টা মাত্র; সবগুলোর পক্ষে নিশ্চিত ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না।
অতএব, কলমের নিব ভাঙার বিষয়টি আইনি বাধ্যবাধকতা নয়; বরং মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর সিদ্ধান্তের প্রতীকী প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হয়।