নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ভরতেঁতুলিয়া গ্রাম দীর্ঘদিন ধরেই ‘শুঁটকির গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত। বংশপরম্পরায় খোলা আকাশের নিচে বাঁশের মাচায় মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরির চিরচেনা দৃশ্যের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে আধুনিক ‘গ্রিন হাউজ ফিশ ড্রায়ার’ প্রযুক্তি। বৈরী আবহাওয়া ও ধুলাবালির ঝুঁকি কমিয়ে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত শুঁটকি তৈরি করছেন স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তা রাকিবুল হাসান। তাঁর উদ্যোগ ইতোমধ্যে এলাকায় সাড়া ফেলেছে।
স্থানীয় শুঁটকি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আত্রাই ও ছোট যমুনা নদী এবং স্থানীয় বিলের টেংরা, পুঁটি, খলসে, টাকি, শোল ও চাঁদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ থেকে যুগ যুগ ধরে শুঁটকি তৈরি হয়ে আসছে। আত্রাই রেলস্টেশনের দুই পাশে ও নদীর ধারে বাঁশের মাচায় তৈরি এসব শুঁটকির চাহিদা দেশজুড়ে রয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও এর কদর রয়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
তবে খোলা আকাশের নিচে রোদে মাছ শুকানোর কারণে ধুলাবালি ও পোকামাকড়ের উপদ্রবের পাশাপাশি বৃষ্টি-কুয়াশায় বিপুল পরিমাণ মাছ পচে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এতে ব্যবসায়ীদের লোকসান গুনতে হয়।
এই ঝুঁকি কমাতে চালু হয়েছে ‘গ্রিন হাউজ ফিশ ড্রায়ার’। এতে নির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় মাছ শুকানো হয়। ড্রায়ারের চারপাশ স্বচ্ছ পলিথিন শিট দিয়ে ঢাকা থাকে। সূর্যের আলো ভেতরে প্রবেশ করলে ঘরের তাপমাত্রা বাইরের তুলনায় বেড়ে যায়। মাছ শুকানোর সময় তৈরি হওয়া জলীয় বাষ্প বের করে দিতে এক্সহস্ট ফ্যান ব্যবহার করা হয়। এতে গরম বাতাসের প্রবাহ বজায় থাকে এবং মাছের শরীরের আর্দ্রতা দ্রুত বাষ্পীভূত হয়।
উদ্যোক্তার দাবি, এই পদ্ধতিতে দ্রুত মাছ শুকানোর পাশাপাশি মাছের প্রাকৃতিক রূপ, রং, স্বাদ ও পুষ্টিগুণ অটুট রাখা সম্ভব হচ্ছে। প্রচলিত পদ্ধতিতে শুঁটকি তৈরি করতে যেখানে পাঁচ থেকে সাত দিন সময় লাগে, সেখানে আধুনিক ড্রায়ারে মাত্র ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় শুঁটকি তৈরি হচ্ছে। ফলে প্রতিকূল আবহাওয়াতেও উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে।
তরুণ উদ্যোক্তা রাকিবুল হাসান বলেন, “আগে খোলা মাঠে মাচা পেতে মাছ শুকাতাম। বৃষ্টি বা ধুলাবালির কারণে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ মাছ নষ্ট হয়ে লোকসান গুনতে হতো। সেই অপচয় রোধ ও স্বাস্থ্যসম্মত শুঁটকি তৈরির ভাবনা থেকেই ইউটিউব ও ইন্টারনেট দেখে ড্রায়ার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিই। এর বড় সুবিধা হলো—সব সময় জীবাণুমুক্ত পরিবেশে মাছ শুকানো যায়। বর্তমানে অনলাইনের পাশাপাশি স্থানীয় বাজারেও স্বাস্থ্যসচেতন ক্রেতাদের মধ্যে এর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, শুরুতে ছোট পরিসরে ‘গ্রিন হাউজ ফিশ ড্রায়ার’ চালু করায় চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত শুঁটকি উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকার সহজ শর্তে ঋণ ও প্রণোদনা দিলে উৎপাদনের পরিধি বাড়ানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি বিদেশে শুঁটকি রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেরও সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
প্রচলিত পদ্ধতিতে শুঁটকি তৈরি করা ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমাদের ব্যবসায় সবচেয়ে বড় চিন্তা বৃষ্টি আর কুয়াশা। পানি লাগলেই মাছ নষ্ট। রাকিবুল যেভাবে ড্রায়ারে কম সময়ে মানসম্মত শুঁটকি বানাচ্ছে, তাতে মাচার চেয়ে ঝুঁকি অনেক কম।”
ব্যবসায়ী রিপন আকন্দ ও মঞ্জু মোল্লা বলেন, তাঁরা বংশপরম্পরায় রোদে ও মাচায় মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করে আসছেন। হঠাৎ বৃষ্টি বা অতিরিক্ত কুয়াশা নামলে মাছ পচে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে তাঁদের তৈরি ঐতিহ্যবাহী শুঁটকির স্বাদ আলাদা। পুঁজির অভাবে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাঁরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারছেন না।
নওগাঁ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফেরদৌস আলী বলেন, আত্রাইয়ের শুঁটকি শিল্পে ‘গ্রিন হাউজ ফিশ ড্রায়ার’ প্রযুক্তির ব্যবহার একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় মাছ শুকানোর ফলে এর পুষ্টিগুণ ও স্বাদ অক্ষুণ্ন থাকে বলে তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, মৎস্য দপ্তরের পক্ষ থেকে উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এ খাতকে আধুনিক করতে ক্লাস্টারভিত্তিক সহায়তার পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ ও সরকারি প্রণোদনার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে দেশীয় নিরাপদ আমিষের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি শুঁটকি রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।