রাজধানীর ভাটারায় পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) আবদুল্লাহ আল জহিরের মালিকানাধীন একটি বাড়িতে মাদকবিরোধী অভিযানে আটক ৮৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সোমবার রাতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ অভিযান চালিয়ে বাড়িটি থেকে তাঁদের আটক করে। এ সময় গাঁজা, ইয়াবা, মদ ও মাদক গ্রহণের বিভিন্ন সামগ্রী উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৯ জন পুরুষ ও ২৬ জন নারী। তাঁদের মধ্যে পুলিশের এক কর্মকর্তার দুই মেয়ে, উচ্চপদস্থ এক আমলার দুই মেয়ে, সাবেক সেনা কর্মকর্তার ছেলে, কর্মরত সেনা কর্মকর্তার মেয়ে, ব্যাংকার এবং ব্যবসায়ীদের সন্তান রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আটক ব্যক্তিদের ডিএমপির সামারি কোর্টে হাজির করা হলে পুরুষদের এক মাসের কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে তাঁদের আরও ১৫ দিন কারাভোগের আদেশ দেওয়া হয়েছে। নারীদের ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা দিতে ব্যর্থ হলে তাঁদের আরও তিন দিন কারাভোগ করতে হবে।
বাড়িটি ঘিরে নানা অভিযোগ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩০০ ফিট সড়কসংলগ্ন পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি-১-এ ‘গোল্ডেন সানরাইজ’ নামের বাড়িটি অবস্থিত। বাড়িটির প্রায় ৫০ গজের মধ্যে খিলক্ষেত থানার একটি পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে।
ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এয়ারবিএনবি ও ট্রাভেলা নামের অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাড়িটি ভাড়া নিয়ে সেখানে নিয়মিত ডিজে পার্টির আয়োজন করা হতো। এসব আয়োজনে মাদক সেবন ও অশালীন নৃত্যের অভিযোগও রয়েছে।
ডিবির তথ্য অনুযায়ী, সোমবার রাতে সেখানে জন্মদিনের পার্টির কথা বলা হলেও মূলত ডিজে পার্টির আয়োজন করা হয়েছিল। এ আয়োজনের সঙ্গে সাদমান রাফিত, পৌরম গুহ ও নাইমুর রহমান রাহির সংশ্লিষ্টতার কথা জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র। বাড়িটির কো-হোস্ট মাহবুবও আয়োজন সম্পর্কে জানতেন বলে সূত্রটির দাবি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপনে ১৯ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে পরদিন সকাল ৯টা পর্যন্ত হাউস পার্টি ও রেইভ আয়োজনের কথা উল্লেখ ছিল। বিজ্ঞাপনে বাড়িটি পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মালিকানাধীন হওয়ায় সেখানে পুলিশি অভিযান হওয়ার আশঙ্কা নেই বলেও দাবি করা হয়েছিল।
মাসে ২০ থেকে ২২টি পার্টির অভিযোগ
ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, বাড়িটিতে ২০২৫ সাল থেকে প্রতি মাসে ২০ থেকে ২২টি ডিজে পার্টির আয়োজন করা হতো। অনলাইনে নিবন্ধনের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা এসব আয়োজনে যোগ দিতেন। পার্টি থেকে আয়ের ৭০ শতাংশ আবদুল্লাহ আল জহিরের ব্যাংক হিসাবে জমা হতো বলেও দাবি করেছে সূত্রটি।
এদিকে, ঘটনার পর অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অভিযানে যা পাওয়া গেছে
অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া ডিএমপির গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির বুধবার যুগান্তরকে বলেন, অভিযান চালানোর সময় বাড়িতে ডিজে পার্টি চলছিল। সেখানে বেশ কয়েকটি গাড়ি ছিল এবং পাঁচটি কক্ষে নারী-পুরুষের উপস্থিতি দেখা যায়।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পার্টির কক্ষে শিশার ধোঁয়া ছিল। সেখান থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের তিন বোতল মদ, কুশ নামের মাদক, ইয়াবা ও জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে।
ইলিয়াস কবির আরও বলেন, বাড়ির সিসিটিভি ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণ অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরের কাছে ছিল। এ ঘটনায় আরও কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের বিষয়ে তদন্ত চলছে।