দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালুর পরও বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনেও দিনে গড়ে মাত্র চার ঘণ্টা সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে আগামী নভেম্বর থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম আরও ১০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে দ্বীপজুড়ে।
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বুধবার বিকেলে দ্বীপের বাজারে বিক্ষোভ মিছিল করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এ সময় তাঁরা দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাতিল, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং প্রকল্পের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
দ্বীপবাসীর অভিযোগ, বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ৪২ থেকে ৫২ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। নভেম্বর থেকে ইউনিটপ্রতি আরও ১০ টাকা বাড়ানো হলে বিদ্যুতের ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে। অথচ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রত্যাশায় ২০১৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি দ্বীপটিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করা হয়েছিল। কিন্তু প্রত্যাশিত সেবা না পাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সীমিত সময় বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে শিক্ষার্থী, সাধারণ পরিবার ও ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। পর্যটন মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ সে অনুযায়ী বাড়ে না। বছরের অন্যান্য সময়েও নিয়মিত বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না বলে তাঁদের অভিযোগ।
বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব, মিটার রিডিং ও বিলের রসিদ নিয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা। বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে বিকল্প জেনারেটর সেবা চালুর প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ তাঁদের।
‘ন্যায্যমূল্যে বিদ্যুৎ চাই’
দ্বীপের বাসিন্দা তৈয়ব উল্লাহ অভিযোগ করেন, শুরু থেকেই বেসরকারি বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি দ্বীপবাসীকে প্রত্যাশিত সেবা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। পর্যটন মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও বছরের বাকি সময়ে পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয় বলে দাবি করেন তিনি।
তৈয়ব উল্লাহ বলেন, ইউনিটপ্রতি আরও ১০ টাকা দাম বাড়ানোর ঘোষণা দ্বীপবাসীর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। তিনি দ্বীপে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চালুর দাবি জানান।
ব্যবসায়ী মনির হোসেন বিদ্যুতের দাম ও সরবরাহ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এত বেশি দামে সীমিত সময়ের জন্য বিদ্যুৎ পাওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি ব্লু-মেরিনের বিদ্যুৎ বয়কটের ঘোষণা দিয়ে ন্যায্যমূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানান।
স্থানীয় বাসিন্দা মুজিবুর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে পড়াশোনা, ব্যবসা ও দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে। বেশি দাম দিয়েও নিয়মিত বিদ্যুৎ না পাওয়ার মধ্যে আবার মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা তাঁদের হতাশ করেছে।
ব্যবসায়ী আহমেদ হোসেন বলেন, সেন্টমার্টিনের ব্যবসা-বাণিজ্য অনেকটাই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। সরবরাহ কম থাকায় ফ্রিজে পণ্য রাখা, আইসক্রিম ও খাবার সংরক্ষণসহ বিভিন্ন কাজে সমস্যা হচ্ছে। বেশি দাম দিয়ে অল্প সময় বিদ্যুৎ পাওয়া ব্যবসায়ীদের জন্য বড় ধরনের ভোগান্তি তৈরি করছে বলে জানান তিনি।
তদন্ত ও সমাধানের দাবি
দ্বীপবাসীর দাবি, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের কার্যক্রম তদন্ত করে অনিয়ম পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া এবং যৌক্তিক মূল্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগও চান তাঁরা।
সেন্টমার্টিন দ্বীপের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে স্থানীয় বাসিন্দারা বিক্ষোভ করেছেন। বিষয়টি সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে ব্লু-মেরিন এনার্জি লিমিটেডের প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত, বিদ্যুৎ সরবরাহের সীমাবদ্ধতা ও স্থানীয়দের অভিযোগ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, বিষয়টি তিনি জেনেছেন। বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
পর্যটননির্ভর সেন্টমার্টিনে বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়ছে গৃহস্থালি, শিক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত সংকটের সমাধান না হলে দ্বীপের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পাশাপাশি পর্যটন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।