রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালিতে সড়ক অবরোধ ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) অবরোধকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের পাশাপাশি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। তবে অবরোধের কারণে আটকে পড়া প্রায় তিন হাজার পর্যটককে নিরাপত্তা দিয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন। এদিকে ঘটনার প্রতিবাদে শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে আধাবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দিয়েছে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ। এতে পাহাড়ের পর্যটন, জনজীবন ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
যেভাবে উত্তপ্ত হলো সাজেক
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ শুরু করে। সাজেক থেকে একটি চিহ্নিত গোষ্ঠীর সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে দেওয়া এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ তিন দফা দাবিতে এ কর্মসূচি শুরু হয়। অবরোধের কারণে সাজেক-দীঘিনালা সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে বেড়াতে যাওয়া বিপুলসংখ্যক পর্যটক আটকা পড়েন।
সকালে সেনাবাহিনী ও পুলিশের নিরাপত্তায় পর্যটকদের সাজেক থেকে খাগড়াছড়ির দিকে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে গঙ্গারাম উজোবাজার এলাকায় পৌঁছালে গাড়িবহর বাধার মুখে পড়ে। ব্যারিকেড সরিয়ে পর্যটকদের এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা এবং অবরোধকারীদের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।
এ সময় সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তায় প্রায় ২ হাজার ৯৩৩ পর্যটককে নিরাপদে খাগড়াছড়িতে সরিয়ে নেওয়া হয়।
অবরোধের নেপথ্যে কী
অবরোধকারী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস—সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন অংশ) সশস্ত্র সদস্যদের উপস্থিতির কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তাঁদের দাবি, এসব সশস্ত্র সদস্যকে সরিয়ে স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
তবে জেএসএস এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সংগঠনটির দাবি, সাজেককে কেন্দ্র করে তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। জেএসএসের সহতথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা বলেন, তাঁদের সংগঠনে কোনো সশস্ত্র সদস্য বা কার্যক্রম নেই। তাঁরা গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তাঁর অভিযোগ, ইউপিডিএফ পাহাড়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।
অন্যদিকে, অবরোধকারী সংগঠনগুলোকে ইউপিডিএফ-ঘনিষ্ঠ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যে ঘটনার কারণ ও দায় নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। কারা প্রথম গুলি চালিয়েছে এবং সংঘর্ষ কীভাবে শুরু হয়েছে, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বন্ধ সাজেক পর্যটনকেন্দ্র, বাড়ছে উদ্বেগ
নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক ভ্যালিতে পর্যটকদের ভ্রমণ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফীর ভাষ্য, পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পর্যটনকেন্দ্রটি সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে।
এ সিদ্ধান্তে পর্যটননির্ভর রিসোর্ট, কটেজ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে সড়ক অবরোধের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচল, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন এবং জুমের ফসল বাজারজাতকরণও ব্যাহত হচ্ছে।
২৪ অক্টোবর নতুন কর্মসূচি
অবরোধকারীদের ওপর হামলা, লাঠিচার্জ এবং ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের অভিযোগে প্রতিবাদ জানিয়েছে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ। সংগঠনটি শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে আধাবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দিয়েছে।
এদিকে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনও নিজেদের দাবিতে অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে। ফলে সড়ক যোগাযোগ ও পর্যটন কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবারের ঘটনার পর জনশূন্য গঙ্গারাম
বৃহস্পতিবারের সংঘর্ষের পর সাজেকের গঙ্গারাম এলাকায় জনশূন্য পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা। তাঁর ভাষ্য, আতঙ্কে অনেক বাসিন্দা বাড়িঘর ও দোকানপাট ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছেন।
তিনি আরও জানান, শুক্রবারও সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ অব্যাহত ছিল। সকাল থেকে বিভিন্ন স্থানে সড়কে টায়ার ও গাছের গুঁড়ি জ্বালিয়ে কর্মসূচি পালন করা হয়। অবরোধের কারণে যান চলাচল বন্ধ থাকলেও শুক্রবার নতুন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি বলে তিনি জানান।
গোলাগুলি নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সময় গঙ্গারাম উজোবাজার এলাকায় গোলাগুলির ঘটনা নিয়ে সেনাবাহিনী ও ইউপিডিএফের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। সেনাবাহিনীর দাবি, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা গুলি চালালে আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালানো হয়। তবে ইউপিডিএফ এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, নিরাপত্তা বাহিনী একতরফাভাবে গুলি চালিয়েছে।
এ ছাড়া অবরোধকারীদের ওপর হামলা, লাঠিচার্জ এবং ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের অভিযোগ তুলেছে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ। এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য পাওয়া জরুরি।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার দাবি পুলিশের
রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আবদুর রকিব বলেন, বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং তা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে।
তিনি জানান, ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে এবং যৌথ বাহিনীর অভিযান চলছে। ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাজেকের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে অবরোধ প্রত্যাহার, স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সংঘর্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন স্থানীয় বিভিন্ন মহল। একই সঙ্গে পর্যটক ও সাধারণ মানুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা না গেলে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।