এক মহল্লায় তিন মেয়র প্রার্থী নিয়ে গ্যাঁড়াকলে সমর্থকরা

আপলোড সময় : ২৪-১০-২০২৬ ১২:০৬:০৪ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৪-১০-২০২৬ ১২:০৬:০৪ অপরাহ্ন

বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি) নির্বাচন ঘিরে আগেভাগেই জমে উঠেছে রাজনৈতিক আলোচনা। সম্ভাব্য মেয়রপ্রার্থীদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন তিন প্রভাবশালী নেতা, যাঁদের সবার বাড়ি নগরীর একই মহল্লা—ব্রাউন কম্পাউন্ডে। তাঁদের দুজন বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী, অন্যজন জামায়াতে ইসলামীর ঘোষিত প্রার্থী। ঘটনাচক্রে বিএনপির দুই মনোনয়নপ্রত্যাশীর একজন সংসদ সদস্য, অন্যজন সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক।

এই তিন নেতা হলেন বিএনপির সংসদ সদস্য সরদার সরফুদ্দিন সান্টু, বিসিসির প্রশাসক বিলকিস জাহান শিরিন এবং জামায়াতে ইসলামীর অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসাইন হেলাল। তাঁদের বাড়ির দূরত্বও খুব বেশি নয়—একজনের বাড়ি থেকে অন্যজনের বাড়ি কয়েক শ গজের মধ্যে। ফলে সম্ভাব্য প্রার্থীদের একই মহল্লায় বসবাস নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে কে কাকে সমর্থন করবেন, তা নিয়ে অস্বস্তি রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য।

সিটি নির্বাচনের নির্দিষ্ট সময়সূচি এখনো জানা না গেলেও বরিশালে এরই মধ্যে নির্বাচনি তৎপরতা শুরু হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। বিএনপির মনোনয়ন পেতে আগ্রহী নেতার সংখ্যা এক ডজনের বেশি বলে জানা গেছে।

জামায়াতের প্রার্থী হেলাল

বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসাইন হেলালকে। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁকে বরিশাল সদর আসনে প্রার্থী করেছিল দলটি। তবে শেষ পর্যন্ত চরমোনাই পীরের প্রতি সম্মান জানিয়ে আসনটি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে ছেড়ে দেয় জামায়াত। ফলে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও পরে তা প্রত্যাহার করেন হেলাল।

পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বরিশালের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হেলাল এবার মেয়র পদে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন।

হেলালের পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ অ্যাডভোকেট শেখ আব্দুল্লাহ নাসিরকে এবং এনসিপি এম আনোয়ার হোসেন সিকদারকে মেয়রপ্রার্থী ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকার কথা রয়েছে নারী নেত্রী ড. মনীষা চক্রবর্তীর।

বিএনপির মনোনয়ন চান এক ডজনের বেশি নেতা

অন্য দলগুলো প্রার্থী ঘোষণা করে নির্বাচনি প্রস্তুতি শুরু করলেও বিএনপিতে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তৎপরতা চলছে। আলোচনায় থাকা নেতাদের মধ্যে রয়েছেন বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সরদার সরফুদ্দিন সান্টু; বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সাবেক সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল; জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমতউল্লাহ ও এবায়েদুল হক চান; কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও বিসিসির বর্তমান প্রশাসক বিলকিস জাহান শিরিন; বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক, সদস্যসচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার ও যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা নাসরিন; দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আবুল কালাম শাহিন; দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান নান্টু এবং মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট মীর জাহিদুল কবিরসহ আরও কয়েকজন।

এই তালিকায় কার ভাগ্যে দলীয় মনোনয়ন জুটবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে একই মহল্লায় সান্টু, শিরিন ও হেলালের বসবাসকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

ব্রাউন কম্পাউন্ডে তিন নেতার বাড়ি

বরিশাল নগরীর অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত ব্রাউন কম্পাউন্ডে তিন নেতারই জন্ম ও বেড়ে ওঠা। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বাড়িতে থাকেন সান্টু ও হেলাল। বিলকিস জাহান শিরিনের স্বামীর বাড়ি বাগেরহাটে হলেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি বাবার বাড়িতে থাকেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, একসময় বিয়ের পর কিছুদিন সংসদ সদস্য সান্টুর বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবেও ছিলেন শিরিন। সে সময় তাঁর স্বামী বোরহান রেজা বরিশাল জেলা পুলিশে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে হেলালের বাড়ি থেকে শিরিনের বাবার বাড়ি খালি চোখে দেখা যায়। আর দুই বাড়ি থেকে সান্টুর বাড়িতে যেতে লাগে মাত্র দুই থেকে তিন মিনিট।

একই মহল্লায় বিএনপির দুই মনোনয়নপ্রত্যাশীর উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা আগে এতটা দৃশ্যমান ছিল না। সম্প্রতি নগরজুড়ে সান্টুর বিলবোর্ড ও পোস্টার লাগানো শুরু হলে মেয়র পদে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগ্রহ নিয়ে আলোচনা বাড়ে।

এ বিষয়ে সরদার সরফুদ্দিন সান্টু বলেন, ‘এখানে একবার মেয়র পদে নির্বাচন করেছিলাম। তখন আমাকে জোর করে হারিয়ে দেওয়া হয়। আমার পক্ষে জনসমর্থন এতটাই বেশি ছিল যে, জোর করে হারাতেও তাদের কষ্ট হয়েছে। মাত্র কয়েকশ ভোটের ব্যবধান দেখিয়ে আমার জয় ছিনিয়ে নেয় আওয়ামী লীগ।’

এবার মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেটা তো দলের চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত। তিনি যদি মনোনয়ন দেন, তাহলে অবশ্যই মেয়র পদে নির্বাচন করব।’

একই মহল্লায় তিন সম্ভাব্য প্রার্থীর অবস্থান নিয়ে জানতে বিসিসি প্রশাসক বিলকিস জাহান শিরিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসাইন হেলাল বলেন, ‘একই পরিবারের দুই ভাই একে অপরের বিরুদ্ধে নির্বাচন করেন—এমন ঘটনাও তো আছে। দুই ভাই নির্বাচন করলেও ভোটাররা বুঝেশুনে যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেন। বিএনপির মেয়রপ্রার্থী যদি ব্রাউন কম্পাউন্ড থেকেই দেওয়া হয়, তাহলে এলাকার লোকজনই ভালো বুঝবেন কাকে ভোট দিলে তাঁদের জন্য ভালো হবে। আমি আশাবাদী, জনগণ তাদের সিদ্ধান্তে ভুল করবে না।’

ভোট ভাগাভাগির আশঙ্কা

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বরিশাল মহানগর বিএনপির এক নেতা বলেন, নির্বাচন নিরপেক্ষ হলে বরিশাল সিটি করপোরেশনে সব সময়ই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়। ব্রাউন কম্পাউন্ড নগরীর ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত। সেখানে ভোটার প্রায় সাড়ে চার হাজার।

ওই নেতার মতে, একই এলাকায় প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের অবস্থান থাকলে স্থানীয় ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে কোনো প্রার্থীই এলাকার বাসিন্দাদের একক সমর্থন পাবেন না। এর প্রভাব বিএনপি ও জামায়াত—দুই দলের প্রার্থীর নির্বাচনি হিসাবেও পড়তে পারে।

তবে একই মহল্লায় বাড়ি হওয়া কতটা ভোটের সমীকরণ বদলাবে, তা নির্ভর করবে দলীয় মনোনয়ন, প্রার্থীদের প্রচার, স্থানীয় সমর্থন এবং নির্বাচনের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর। বিএনপি শেষ পর্যন্ত কাকে মনোনয়ন দেয়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদক: শাকিলা জাহান
মোবাইল: ০১৩০১১০৪০৭০ ই-মেইল: info@gbanglanews.com

অফিস :

জি.এম বাংলা লিমিটেডের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান।

৫৬-৫৭, শরীফ ম্যানশন, মতিঝিল রোড, ঢাকা-১০০০