স্ত্রী দাম্পত্য অধিকার আদায় করতে না পারলে দ্বিতীয় বিয়ে করা যাবে কি?

আপলোড সময় : ২৫-১০-২০২৬ ০৬:৫৬:৩৮ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৫-১০-২০২৬ ০৬:৫৬:৩৮ অপরাহ্ন

বিবাহিত জীবনে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই কিছু অধিকার ও দায়িত্ব রয়েছে। পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ ও সহনশীলতার মধ্য দিয়ে একটি সুন্দর দাম্পত্য সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তবে কখনো কখনো স্ত্রীর অসুস্থতা, শারীরিক দুর্বলতা, মানসিক সমস্যা কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধের কারণে দাম্পত্য সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—স্ত্রী দাম্পত্য চাহিদা পূরণ করতে না পারলে স্বামী কি দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন? ইসলাম এ বিষয়ে কী বলে? দ্বিতীয় বিয়ে করলে প্রথম স্ত্রীর অধিকার ও ভরণপোষণের দায়িত্ব কীভাবে পালন করতে হবে?

ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক চাহিদাকে স্বীকার করে। তবে ব্যক্তিগত চাহিদা পূরণের অজুহাতে অন্যের প্রতি অবিচার করার অনুমতি দেয় না। এ বিষয়ে ইসলামের বিধান বুঝতে পবিত্র কোরআন, হাদিস এবং পারিবারিক দায়িত্বসংক্রান্ত নির্দেশনা বিবেচনা করা প্রয়োজন।

১. স্ত্রী দাম্পত্য অধিকার পূরণ করতে না পারলে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি আছে কি?

ইসলামে একজন পুরুষের জন্য নির্দিষ্ট শর্তে একাধিক বিয়ের অনুমতি রয়েছে। তবে এ অনুমতির সঙ্গে ন্যায়বিচার ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি জড়িত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—

فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُم مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَىٰ وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً

অর্থ: ‘অতএব, নারীদের মধ্যে যাদের তোমাদের ভালো লাগে, তাদের বিয়ে কর দুই, তিন অথবা চারজনকে। কিন্তু যদি আশঙ্কা করো যে, তোমরা ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তাহলে একজনকেই বিয়ে কর।’ (সুরা আন-নিসা, আয়াত ৩)

এই আয়াত অনুযায়ী, একজন পুরুষ সর্বোচ্চ চারজন নারীকে বিয়ে করতে পারেন। তবে একাধিক স্ত্রীর মধ্যে ন্যায়বিচার করতে না পারার আশঙ্কা থাকলে একজন স্ত্রীতেই সীমাবদ্ধ থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সুতরাং, স্ত্রী দাম্পত্য চাহিদা পূরণ করতে না পারলে স্বামী দ্বিতীয় বিয়ের কথা বিবেচনা করতে পারেন। তবে শুধু এ কারণে দ্বিতীয় বিয়ে করা বাধ্যতামূলক নয়। স্ত্রীর অক্ষমতার কারণ, স্বামীর সামর্থ্য এবং উভয়ের অধিকার বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

স্ত্রী অসুস্থতা, শারীরিক অক্ষমতা কিংবা অনিচ্ছাকৃত কোনো সমস্যার কারণে দাম্পত্য সম্পর্কে অংশ নিতে না পারলে তাঁকে অপমান বা দোষারোপ না করে সমস্যার কারণ বোঝার চেষ্টা করা উচিত। প্রয়োজন হলে চিকিৎসা ও পরামর্শের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

২. স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই দাম্পত্য অধিকার রয়েছে

ইসলামে দাম্পত্য সম্পর্ক একতরফা অধিকারভিত্তিক নয়। স্বামীর যেমন স্ত্রীর ওপর অধিকার রয়েছে, তেমনি স্ত্রীরও স্বামীর ওপর অধিকার রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ

অর্থ: ‘আর নারীদের জন্যও ন্যায়সংগতভাবে তেমন অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের ওপর দায়িত্ব রয়েছে।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত ২২৮)

এই আয়াতের শিক্ষা হলো, দাম্পত্য জীবনে উভয়ের অধিকার ও দায়িত্ব ন্যায়সংগতভাবে বিবেচনা করতে হবে। স্বামী নিজের চাহিদার কথা জানাতে পারেন, তবে স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা, মানসিক স্বস্তি ও বাস্তব সীমাবদ্ধতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

অসুস্থতা, শারীরিক ব্যথা, প্রসব-পরবর্তী জটিলতা, মানসিক চাপ কিংবা দাম্পত্য কলহের কারণে সমস্যা দেখা দিলে তা সমাধানের জন্য আন্তরিক উদ্যোগ নেওয়া উচিত। কোনো সমস্যার কারণে স্ত্রীকে সরাসরি অবাধ্য বা অধিকারহরণকারী আখ্যা দেওয়া যথাযথ নয়।

৩. দ্বিতীয় বিয়ের আগে কী করণীয়?

দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ক. সমস্যার প্রকৃত কারণ জানা

স্ত্রী কেন দাম্পত্য সম্পর্কে অংশ নিতে পারছেন না, তা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। এর পেছনে শারীরিক অসুস্থতা, হরমোনজনিত সমস্যা, ব্যথা, মানসিক উদ্বেগ, দাম্পত্য কলহ কিংবা অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে। সমস্যা চিকিৎসাযোগ্য হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

খ. সম্মানজনক আলোচনা করা

দাম্পত্য জীবনের সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে অপমান, হুমকি কিংবা চাপ প্রয়োগ না করে শান্তভাবে আলোচনা করা উচিত। স্ত্রীকে তাঁর কষ্ট ও সীমাবদ্ধতা প্রকাশের সুযোগ দিতে হবে। একইভাবে স্বামীর অনুভূতি ও প্রয়োজনের কথাও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন।

গ. পরামর্শ ও সহযোগিতা নেওয়া

সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসক, দাম্পত্য পরামর্শদাতা, বিশ্বস্ত পারিবারিক মধ্যস্থতাকারী কিংবা যোগ্য আলেমের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। লক্ষ্য হওয়া উচিত সম্পর্কের উন্নতি এবং উভয়ের অধিকার রক্ষা করা।

ঘ. দায়িত্ব পালনের সামর্থ্য যাচাই করা

সব চেষ্টা সত্ত্বেও সমস্যার সমাধান না হলে স্বামী দ্বিতীয় বিয়ের কথা বিবেচনা করতে পারেন। তবে তাঁকে ভাবতে হবে, দুই সংসারের ভরণপোষণ, বাসস্থান, সময় বণ্টন এবং অন্যান্য প্রাপ্য অধিকার যথাযথভাবে আদায় করার সামর্থ্য তাঁর রয়েছে কি না।

৪. দ্বিতীয় বিয়ের পর স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে হবে কি?

হ্যাঁ। একাধিক স্ত্রী থাকলে তাঁদের প্রাপ্য অধিকার রক্ষা এবং ন্যায়সংগত আচরণ করা স্বামীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَلَنْ تَسْتَطِيعُوا أَنْ تَعْدِلُوا بَيْنَ النِّسَاءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ ۖ فَلَا تَمِيلُوا كُلَّ الْمَيْلِ فَتَذَرُوهَا كَالْمُعَلَّقَةِ

অর্থ: ‘তোমরা যতই আগ্রহী হও না কেন, স্ত্রীদের মধ্যে পুরোপুরি সমতা রক্ষা করতে কখনোই সক্ষম হবে না। সুতরাং তোমরা একদিকে সম্পূর্ণভাবে ঝুঁকে পড়ো না, যার ফলে অন্য স্ত্রীকে ঝুলন্ত অবস্থায় রেখে দাও।’ (সুরা আন-নিসা, আয়াত ১২৯)

এখানে অন্তরের ভালোবাসায় সম্পূর্ণ সমতা আনা মানুষের পক্ষে সম্ভব না হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, স্বামী ইচ্ছামতো একজন স্ত্রীকে অবহেলা করতে পারবেন।

ভরণপোষণ, বাসস্থান, পালাক্রমে রাতযাপন এবং অন্যান্য প্রাপ্য অধিকারের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার করতে হবে। একজন স্ত্রীকে অবহেলা করে অন্যজনকে সব সুযোগ-সুবিধা দেওয়া কিংবা প্রথম স্ত্রীকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে দেওয়া ইসলামের ন্যায়বিচারের শিক্ষার পরিপন্থী।

৫. স্ত্রীদের সঙ্গে ভালো আচরণ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশনা

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي

অর্থ: ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।’ (জামে আত-তিরমিজি, হাদিস ৩৮৯৫)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করা উত্তম চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়। স্ত্রী দাম্পত্য চাহিদা পূরণ করতে না পারলেও স্বামীর উচিত নয় তাঁকে অপমান করা, নির্যাতন করা কিংবা তাঁর প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা।

দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলেও প্রথম স্ত্রীর প্রতি সম্মানজনক আচরণ, আর্থিক দায়িত্ব পালন এবং তাঁর প্রাপ্য অধিকার সংরক্ষণ করতে হবে।

৬. দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি কি আবশ্যক?

এ বিষয়ে শরিয়তের বিধান এবং দেশের প্রচলিত আইন আলাদাভাবে বুঝতে হবে।

ইসলামি ফিকহের প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিয়ের বৈধতার জন্য প্রথম স্ত্রীর সম্মতিকে সর্বাবস্থায় অপরিহার্য শর্ত হিসেবে গণ্য করা হয় না। তবে এর অর্থ এই নয় যে, প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে প্রতারণা করা কিংবা তাঁর অধিকার নষ্ট করা গ্রহণযোগ্য।

অন্যদিকে, বাংলাদেশে প্রচলিত মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৬ ধারায় বিদ্যমান বিবাহ চলাকালে আরেকটি বিয়ের ক্ষেত্রে সালিশি পরিষদের পূর্বানুমতির বিধান রয়েছে। তাই বাংলাদেশে দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রযোজ্য আইনি শর্ত ও অনুমতির প্রক্রিয়া সম্পর্কে আইনজীবী বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

অর্থাৎ, শরিয়তগত বিধান এবং দেশের আইন অনুযায়ী বিয়ে সম্পাদনের প্রক্রিয়া দুটি পৃথক বিষয়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে উভয় দিক বিবেচনা করা প্রয়োজন।

৭. স্ত্রী দাম্পত্য চাহিদা পূরণ করতে না পারলে তালাক দেওয়া কি বাধ্যতামূলক?

না। স্ত্রী দাম্পত্য চাহিদা পূরণ করতে না পারলেই তাঁকে তালাক দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মূল্যায়ন কেবল একটি বিষয় দিয়ে করা উচিত নয়। পারস্পরিক ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, সন্তানদের কল্যাণ, দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং সমস্যা সমাধানের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

চিকিৎসা, আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব হলে সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা করা যেতে পারে। আবার দীর্ঘস্থায়ী অমিলের কারণে সংসার টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়লে শরিয়তসম্মত অন্যান্য পথ বিবেচনা করা যেতে পারে।

সবশেষে, স্ত্রী দাম্পত্য চাহিদা পূরণ করতে না পারলে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের সুযোগ ইসলামে রয়েছে। তবে তা দায়িত্বহীনভাবে বা শুধু ব্যক্তিগত চাহিদার অজুহাতে গ্রহণ করার বিষয় নয়। এর সঙ্গে ন্যায়বিচার, আর্থিক সামর্থ্য, স্ত্রীর অধিকার এবং পারিবারিক দায়িত্বের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

প্রথমেই স্ত্রীর সমস্যার কারণ বোঝা, প্রয়োজন হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত। এরপরও সমস্যার সমাধান না হলে দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে দুই স্ত্রীর অধিকার রক্ষা এবং প্রযোজ্য আইন মেনে চলার সামর্থ্য থাকা জরুরি।

আল্লাহ তাআলা আমাদের দাম্পত্য জীবনকে ভালোবাসা, রহমত, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ন্যায়বিচারে পরিপূর্ণ করুন। আমিন।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদক: শাকিলা জাহান
মোবাইল: ০১৩০১১০৪০৭০ ই-মেইল: info@gbanglanews.com

অফিস :

জি.এম বাংলা লিমিটেডের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান।

৫৬-৫৭, শরীফ ম্যানশন, মতিঝিল রোড, ঢাকা-১০০০