ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে কুমিল্লার দেবিদ্বারে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অভিযোগ রয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য রাজী মোহাম্মদ ফখরুলের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তাঁর বাড়িতে গোপনে টর্চার সেল পরিচালনা করা হতো। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা কিংবা অনিয়মের প্রতিবাদ করলে সেখানে তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হতো বলে দাবি তাঁদের।
এ ছাড়া চার শতাধিক সদস্যের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী গঠন, পূজামণ্ডপে পিস্তল উঁচিয়ে গুলি ছোড়া, সংসদ ভবনে উপজেলা চেয়ারম্যানকে মারধর এবং উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগেও তাঁর নাম এসেছে। একাধিক সূত্রের দাবি, বর্তমানে থাইল্যান্ডে অবস্থান করে ব্যবসার পাশাপাশি রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সংসদ সদস্য থাকাকালে দেবিদ্বারে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাজী ফখরুল। তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্থকদের ভয়ভীতি দেখানো এবং উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
রাজী মোহাম্মদ ফখরুল তাঁর বাবা ফখরুল ইসলাম মুন্সীর হাত ধরে রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ২০০৮ সালে তিনি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে দ্বিতীয়বার সংসদ সদস্য হন। তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আবুল কালাম আজাদের কাছে পরাজিত হন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতেন রাজী ফখরুল। আওয়ামী লীগের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ততার সূত্র ধরে কখনো শেখ রেহানা, কখনো তাঁর ছেলে রাদওয়ান সিদ্দিক মুজিব ববি, আবার কখনো তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ পরিচয় কাজে লাগিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে প্রভাব বিস্তার এবং বড় প্রকল্পে তদবির বাণিজ্যে যুক্ত থাকার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। নিয়োগ, সরকারি কেনাকাটা ও বিভিন্ন লাভজনক কাজকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি তিনি পৈতৃক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও পরিচালনা করতেন।
নির্বাচনে অস্ত্র প্রদর্শন ও ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ
২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেবিদ্বারের ঐতিহ্যবাহী ফখরুল মুন্সী বাড়িতে অস্ত্রধারীদের উপস্থিতি ও প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগ ওঠে। রাজী ফখরুলের ক্যাডার ও সমর্থকেরা সেখানে অস্ত্র প্রদর্শন করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
একই সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্থক ও সাধারণ ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে না যেতে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে।
চার শতাধিক সদস্যের ক্যাডার বাহিনী ও টর্চার সেলের অভিযোগ
সংসদ সদস্য থাকাকালে দেবিদ্বারে আধিপত্য ধরে রাখতে চার শতাধিক সদস্যের একটি সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে রাজী ফখরুলের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, উপজেলা ছাত্রলীগের নেতা রুবেল ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বে বাহিনীটি পরিচালিত হতো। তাঁদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি দেখানো এবং মারধরের অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, রাজী ফখরুলের নিজ বাড়িতে গোপনে একটি টর্চার সেল পরিচালনা করা হতো। তাঁর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা কিংবা অনিয়মের প্রতিবাদ করলে রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে সেখানে তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। ক্ষমতার প্রভাবের কারণে ভুক্তভোগীদের অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পেতেন না বলেও দাবি স্থানীয়দের।
পাওয়া যায়নি রাজী ফখরুলের বক্তব্য
দেশের বাইরে অবস্থানের কারণে সাবেক সংসদ সদস্য রাজী মোহাম্মদ ফখরুলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ও মেসেঞ্জারের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।