ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা ও ভোট চাওয়ার সময় পাশে বসে হাততালি দেওয়ার ঘটনায় বিতর্কে জড়িয়েছেন পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গোলাম রব্বানী সরদার। এ ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর এক সাংবাদিকের সঙ্গে তাঁর ফোনালাপের অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও সরকারি কর্মকর্তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ২০ অক্টোবর পীরগঞ্জ উপজেলার সেনগাঁও ইউনিয়নের আমতলী পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে যান ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান। পূজার শুভেচ্ছা বিনিময়ের ওই অনুষ্ঠানে ইউএনও গোলাম রব্বানী সরদারসহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
মণ্ডপে দেওয়া বক্তব্যে সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান সেনগাঁও ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান সাইদুর রহমানকে আসন্ন ইউপি নির্বাচনে দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। এ সময় তিনি প্রকাশ্যে ভোট চাওয়া ও প্রচারের আহ্বান জানান। পাশে বসে থাকা সাইদুর রহমান হাত জোড় করে ধন্যবাদ জানান। আর ওই মুহূর্তে সংসদ সদস্যের পাশে বসা ইউএনওকে হাততালি দিতে দেখা যায়। বক্তব্যের অন্যান্য অংশেও তাঁকে একাধিকবার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাংবাদিকের সঙ্গে ফোনালাপের অডিও ঘিরে বিতর্ক
ঘটনার ভিডিও নিয়ে বক্তব্য জানতে এক সাংবাদিক ইউএনওর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেন। ওই কথোপকথনের একটি অডিও পরে ছড়িয়ে পড়ে। অডিওতে ইউএনওকে বলতে শোনা যায়, ‘শুধু কি আমি হাততালি দিছি, ওসি সাহেব দেয় নাই? ভালো করে দেখেন। না হলে ভালো করে লিখে দেন এমপির সঙ্গে ইউএনও নির্বাচনি প্রচারণায়।’
কথোপকথনের একপর্যায়ে তাঁকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘আপনি এভাবে বলেন... ইউএনও ইজ ওয়ান অব দ্য বিএনপি লিডারস অব পীরগঞ্জ! যে দলের সরকার থাকবে, আমি সেই দলেরই নেতা। বোঝা গেছে মেসেজটা?’
অডিওতে ইউএনও আরও বলেন, ‘এমপির বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা আমার কেন, আমার সেক্রেটারিরও নাই....সবাই তালি দিচ্ছে, আমি না দিলে এমপি স্যার তো মাইন্ড করবে!’
তবে ছড়িয়ে পড়া অডিওটির পূর্ণাঙ্গতা, প্রেক্ষাপট ও সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়।
আগের বক্তব্যে ‘অনিচ্ছাকৃত’ বলেছিলেন ইউএনও
এর আগে গণমাধ্যমকে ইউএনও জানিয়েছিলেন, সংসদ সদস্য তাঁকে ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া হবে কিংবা কোনো প্রার্থীকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে, তা তাঁর জানা ছিল না। হাততালির ঘটনাটিকে তিনি ‘অনিচ্ছাকৃত’ বলেও উল্লেখ করেছিলেন।
তবে পরবর্তী সময়ে ছড়িয়ে পড়া ফোনালাপের বক্তব্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ ঘটনায় সরকারি কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা ও নির্বাচনী আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধিতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং কোনো প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে কোনো সরকারি কর্মকর্তা নির্বাচনী প্রচারের পরিবেশে কী ভূমিকা পালন করেছেন, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার দাবি উঠেছে।
রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের প্রতিক্রিয়া
সিপিবি ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবু সায়েম এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ওই প্রার্থী প্রশাসনিকভাবে বাড়তি সুবিধা পাবেন এবং সাধারণ প্রার্থীরা আস্থার সংকটে পড়বেন।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর ঠাকুরগাঁও জেলা সভাপতি আব্দুল লতিফ বলেন, ‘একজন কর্মকর্তার মুখে এ ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য ও পক্ষপাতমূলক আচরণ নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড চিরতরে ধ্বংস করবে।’
বিষয়টি নিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, ‘ভিডিওটি দেখেছি। বিষয়টি নিয়ে ইউএনওকে সতর্ক করেছি।’