ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আবারও জয়ী হয়েছেন বামপন্থী নেতা লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের জন্যও পরিচিত এই নেতা রোববারের রান-অফ নির্বাচনে ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়েছেন। জানুয়ারিতে তাঁর চতুর্থ মেয়াদ শুরু হওয়ার কথা। তবে অর্থনীতি সামলাতে নতুন মেয়াদে তাঁকে বেশ কয়েকটি কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।
গত কয়েক বছরে ব্রাজিলের অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করেছে। তবে সরকারি ঋণের ক্রমবৃদ্ধি, উচ্চ সুদের হার, পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণসংকট এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা লুলা সরকারের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠতে পারে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে অর্থনীতিতে তাঁর সামনে থাকা পাঁচটি প্রধান চ্যালেঞ্জ।
১. আকাশছোঁয়া সরকারি ঋণ
লুলার বর্তমান মেয়াদে ব্রাজিলের সরকারি ঋণ বেড়েছে ১০ শতাংশীয় পয়েন্টের বেশি। বর্তমানে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৮২ শতাংশেরও বেশি সরকারি ঋণের পরিমাণ। এর ফলে সরকারের ঋণ নেওয়ার ব্যয়ও বেড়েছে।
বছরের পর বছর বাধ্যতামূলক সরকারি ব্যয় বাড়তে থাকায় বাজেটের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে ফেডারেল বাজেটের ৮ শতাংশেরও কম অর্থ সরকার নিজের অগ্রাধিকার অনুযায়ী ব্যয় করতে পারে।
সরকারি ঋণ নিয়ন্ত্রণে লুলার অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কখনো তিনি ঋণ নিয়ে উদ্বেগকে ‘বাজে কথা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তাঁর দল জানিয়েছে, বর্তমান রাজস্বনীতি বজায় রাখা হবে। এই নীতিতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির সীমা নির্ধারণ করা আছে এবং সুদ পরিশোধ বাদ দিয়ে রাজস্ব উদ্বৃত্তের লক্ষ্যমাত্রাও ঠিক করা হয়। নিয়ম আরও কঠোর করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়নি দলটি।
তবে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ কঠিন হতে পারে। লুলা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ন্যূনতম মজুরি মূল্যস্ফীতির চেয়ে দ্রুত বাড়ানো হবে। এতে পেনশন বাবদ সরকারি ব্যয়ও বাড়বে। এরই মধ্যে তাঁর সরকার সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা বাড়িয়েছে এবং নতুন ব্যয়ের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।
২. চড়া সুদের হার ও নিয়ন্ত্রণে না আসা মূল্যস্ফীতি
ব্রাজিলে সুদের হার উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুদের হার ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। অথচ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৩ শতাংশ এবং সহনসীমা ১ দশমিক ৫ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
অর্থনীতির গতি কমে আসার লক্ষণ দেখা দেওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক টানা পঞ্চমবারের মতো সুদের হার কমিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাজারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৯ সাল পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৩ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রার ওপরে থাকতে পারে।
লুলার নির্বাচনী ইশতেহারে সুদের হার কমানোর প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তিনি বলেছেন, সামাজিক কর্মসূচিগুলো অক্ষুণ্ন রেখেই রাজস্ব শৃঙ্খলা বজায় রাখা হবে। তবে অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে না আনলে সুদের হার দ্রুত কমানো কঠিন হবে। সামাজিক ব্যয় বজায় রাখা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করবেন, সেটিই হবে লুলার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
৩. ঋণের চাপে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান
ব্রাজিলের ঋণসংকট শুধু সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ক্রেডিট ব্যুরো সেরাসার তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ৮ কোটি ৪০ লাখ মানুষ ঋণ পরিশোধে পিছিয়ে রয়েছেন। একই পরিস্থিতিতে রয়েছে প্রায় ৯৩ লাখ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। উভয় ক্ষেত্রেই এটি রেকর্ড পর্যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উচ্চ সুদের হারকে এ সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঋণের চাপ জনমনে অসন্তোষ বাড়াচ্ছে। অথচ অর্থনীতির অন্য কিছু সূচক ইতিবাচক। বেকারত্বের হার রেকর্ড পর্যায়ে কমেছে এবং মজুরি মূল্যস্ফীতির চেয়ে দ্রুত বাড়ছে।
এ পরিস্থিতিতে লুলা সরকার নতুন করে ঋণ পরিশোধে স্বস্তি দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এর আওতায় ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে আর্থিক সংকটে থাকা পরিবারের ঋণ ছাড়ে কিনে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্যও কিছু কর ও ঋণসংক্রান্ত ছাড়ের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব পদক্ষেপ সাময়িক স্বস্তি দিলেও মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান নাও হতে পারে।
সহজলভ্য কিন্তু ব্যয়বহুল ঋণের ব্যবহার কমানোর বিষয়েও সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্রেডিট কার্ডের ঋণ ও জামানতবিহীন ভোক্তা ঋণ। তবে এ বিষয়ে এখনো বিস্তারিত প্রস্তাব প্রকাশ করা হয়নি।
৪. সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক সমর্থনের ঘাটতি
নিজের অর্থনৈতিক কর্মসূচি কংগ্রেসে পাস করানো লুলার জন্য কঠিন হতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮০-এর দশকে গণতন্ত্রে ফেরার পর ব্রাজিলে এবার সবচেয়ে রক্ষণশীল আইনসভা নির্বাচিত হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুলা ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করলেও বলসোনারোর লিবারেল পার্টি ও তাদের মিত্রদের দুই কক্ষেই উল্লেখযোগ্য প্রভাব থাকবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক বাধা তৈরি হতে পারে।
লুলার সহযোগীরা জানিয়েছেন, সরকার করছাড় কমানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। তবে করের বোঝা বাড়তে পারে—এমন পদক্ষেপে আইনপ্রণেতারা আগেও বাধা দিয়েছেন।
বর্তমান মেয়াদেই সুপ্রিম কোর্ট, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সিকিউরিটিজ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও প্রতিযোগিতা কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য প্রার্থী মনোনয়ন এবং সিনেটের অনুমোদন পেতে লুলাকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। কংগ্রেসে রক্ষণশীলদের প্রভাব বাড়লে ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ আরও জটিল হতে পারে।
৫. কর সংস্কার বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা
২০২৩ সালে লুলা সরকার কংগ্রেসের সমর্থনে ভোগ্যপণ্যের করব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার অনুমোদন করায়। এ সংস্কারের অংশ হিসেবে জানুয়ারিতে নতুন মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) চালুর কথা রয়েছে। তবে কার্যকর হওয়ার সময় ঘনিয়ে এলেও সরকার এখনো করের চূড়ান্ত হার ঘোষণা করেনি। স্বাধীন বিশ্লেষকদের ধারণা, এ হার প্রায় ২৮ শতাংশ হতে পারে।
এ ছাড়া স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পণ্যের ওপর নতুন কর আরোপের একটি বিল নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় কংগ্রেসে উত্থাপন করেনি সরকার। প্রস্তাবিত পণ্যের মধ্যে রয়েছে সিগারেট ও মদ।
বিলটি উত্থাপনে বিলম্ব হলে প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায়ও পিছিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে করনীতি বাস্তবায়নে সরকারের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমালোচনা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক ধারা ধরে রাখার পাশাপাশি সরকারি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, মূল্যস্ফীতি কমানো, পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণসংকট মোকাবিলা এবং রাজনৈতিক সমর্থন নিয়ে সংস্কার বাস্তবায়ন—এই পাঁচ ক্ষেত্রে লুলা সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তই ব্রাজিলের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।