চুল পড়ার সমস্যা এখন আর শুধু ৩০ বা ৪০ বছর বয়সীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কিশোর বয়সের শেষ দিকে কিংবা ২০-এর কোঠায় থাকা অনেক তরুণের মধ্যেও চুল পড়া, কপালের চুল পেছনে সরে যাওয়া বা মাথার মাঝখানে চুল পাতলা হয়ে যাওয়ার সমস্যা দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অল্প বয়সে চুল পড়ার পেছনে সাধারণত একটি নয়, একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। এর মধ্যে বংশগত প্রবণতা, মানসিক চাপ, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক অসুস্থতা ও জীবনযাপনের ধরন উল্লেখযোগ্য। তবে শরীরচর্চায় ব্যবহৃত ক্রিয়েটিন সরাসরি চুল পড়ার কারণ—এমন নিশ্চিত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
বংশগত কারণ
তরুণদের চুল পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ বংশগত প্রবণতা। বিশেষ করে কপালের চুল পেছনে সরে যাওয়া বা মাথার মাঝখানে ধীরে ধীরে চুল পাতলা হওয়ার ক্ষেত্রে অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেশিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বংশগত কারণে চুলের গোড়া অ্যান্ড্রোজেন হরমোনের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হতে পারে। বিশেষ করে ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন (ডিএইচটি) হরমোনের প্রভাবে চুলের গোড়া ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যায়। ফলে সময়ের সঙ্গে চুল পাতলা ও সরু হতে থাকে।
এ ধরনের বংশগত প্রবণতা শুধু মায়ের দিক থেকেই আসে—এ ধারণা সঠিক নয়। পরিবারের বাবা বা মা—উভয় দিক থেকেই এর প্রভাব আসতে পারে।
চুল পড়ার ধরনও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কপালের দুই পাশের চুল ধীরে ধীরে পেছনে সরে যাওয়া, মাথার মাঝখানে চুল পাতলা হওয়া এবং চুল ক্রমে সরু হয়ে যাওয়ার ধরন সাধারণত হঠাৎ করে পুরো মাথায় চুল পড়ে যাওয়ার চেয়ে আলাদা।
মানসিক চাপেও বাড়তে পারে চুল পড়া
পরীক্ষা বা কর্মক্ষেত্রের চাপ, মানসিক উদ্বেগ, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, দ্রুত ওজন কমানো কিংবা কোনো শারীরিক অসুস্থতাও চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধির চক্রে প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ক্ষেত্রে টেলোজেন এফ্লুভিয়াম নামে একটি সমস্যা দেখা দিতে পারে। এতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সংখ্যক চুল অকালেই ঝরে পড়ার পর্যায়ে চলে যায়। কোনো মানসিক চাপ বা অসুস্থতার কয়েক মাস পরও চুল পড়া শুরু হতে পারে। ফলে অনেকেই আগের কোনো ঘটনা বা অসুস্থতার সঙ্গে চুল পড়ার সম্পর্ক বুঝতে পারেন না।
ক্রিয়েটিন কি চুল পড়ার কারণ?
শরীরচর্চা করা তরুণদের মধ্যে ক্রিয়েটিন ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। তবে ক্রিয়েটিন সরাসরি চুল পড়ার কারণ—এমন নিশ্চিত প্রমাণ এখনো নেই।
ক্রিয়েটিন নিয়ে উদ্বেগের একটি কারণ হলো, কিছু গবেষণায় এটি ব্যবহারের সঙ্গে ডিএইচটি হরমোনের মাত্রার পরিবর্তনের বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে কোনো হরমোনের মাত্রা বাড়লেই ক্রিয়েটিনের কারণে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় চুল পড়বে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই।
যাদের বংশগতভাবে অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেশিয়ার ঝুঁকি রয়েছে, তারা ক্রিয়েটিন ব্যবহারের সময় চুলের ঘনত্ব ও চুল পড়ার ধরনে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। তবে শুধু চুল পড়ার আশঙ্কায় সব তরুণকে ক্রিয়েটিন এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ বর্তমানে নেই।
খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন
শরীরে পুষ্টির ঘাটতি বা দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক চাপ তৈরি হলে চুলের বৃদ্ধির ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে। পর্যাপ্ত প্রোটিন না খাওয়া, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং আয়রনসহ বিভিন্ন পুষ্টির ঘাটতি কিছু মানুষের চুল পড়ার কারণ হতে পারে।
তবে চুল পড়লেই শরীরে পুষ্টির ঘাটতি রয়েছে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ নির্ণয় না করে নিজের ইচ্ছায় বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি-পরিপূরক গ্রহণ করাও সমাধান নয়।
অল্প বয়সে হঠাৎ করে অতিরিক্ত চুল পড়া, চুলের ঘনত্ব দ্রুত কমে যাওয়া বা কপালের চুল অস্বাভাবিকভাবে পেছনে সরে যেতে থাকলে কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। এতে বংশগত চুল পড়া, পুষ্টির ঘাটতি বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার মধ্যে কোনটি দায়ী, তা নির্ণয় করা সহজ হয়।