বিদ্যুতের মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ নিয়ে প্রশ্ন ও আপত্তি কেন?

আপলোড সময় : ১৯-০৯-২০২৬ ০৮:৫৩:৪৫ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১৯-০৯-২০২৬ ০৮:৫৩:৪৫ অপরাহ্ন

বিদ্যুতের বিল নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভ বাড়ছে। জুনে নতুন বিদ্যুৎ মূল্য নির্ধারণের পর শহর-গ্রাম নির্বিশেষে প্রিপেইড ও পোস্টপেইড মিটার ব্যবহারকারীদের অনেকেই বিল বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করছেন।

বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ হিসেবে আদায় করা অর্থ নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন গ্রাহকেরা।

বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য সাতটি স্ল্যাব রয়েছে। ব্যবহারের পরিমাণ অনুযায়ী নির্ধারিত স্ল্যাবে প্রতি ইউনিটের দাম হিসাব করা হয়। নতুন মূল্য অনুযায়ী ৪০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটের দাম ১৫ টাকা ১ পয়সা এবং ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরবর্তী প্রতি ইউনিটের দাম ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা। এর সঙ্গে ৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত হয়।

বিদ্যুৎ বিলের পাশাপাশি গ্রাহকের অনুমোদিত লোড অনুযায়ী প্রতি কিলোওয়াটে ৪২ টাকা ডিমান্ড চার্জ নেওয়া হয়। মিটার কেনা না থাকলে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মিটার ভাড়াও যুক্ত হয়। আগের মাসের বকেয়া থাকলে তার সঙ্গে বিলম্ব মাশুলও যোগ হয়।

অর্থাৎ বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট, বিলম্ব মাশুল এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মিটার ভাড়া যুক্ত হতে পারে। প্রিপেইড মিটারে টাকা রিচার্জ করার সময় এসব চার্জ কেটে নেওয়ার পর অবশিষ্ট অর্থ বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য মিটারে জমা হয়।

ডিমান্ড চার্জ কেন?

বিদ্যুৎ খাতে ডিমান্ড চার্জ হলো গ্রাহকের নির্ধারিত লোড অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহের অবকাঠামো, ট্রান্সফরমার, বিতরণ লাইন ও সংযোগ প্রস্তুত রাখার জন্য নেওয়া চার্জ। মিটার ভাড়া নেওয়া হয় মিটার স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ হিসেবে।

বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোওয়াট লোডের জন্য ডিমান্ড চার্জ ৪২ টাকা। ফলে দুই কিলোওয়াট লোডের গ্রাহকের মাসিক ডিমান্ড চার্জ ৮৪ টাকা। ১০ কিলোওয়াট লোড হলে দিতে হয় ৪২০ টাকা।

গ্রাহকদের কেউ কেউ বলছেন, সংযোগ নেওয়ার সময় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি লোড অনুমোদন নেওয়ায় ব্যবহার কম হলেও প্রতি মাসে সেই অতিরিক্ত লোডের জন্য ডিমান্ড চার্জ দিতে হচ্ছে।

একজন গ্রাহক জানান, কারিগরি বিষয় না বুঝে তিনি ১৫ কিলোওয়াট লোডের সংযোগ নিয়েছেন। ফলে প্রতি মাসে শুধু ডিমান্ড চার্জ বাবদ ৬৩০ টাকা দিতে হচ্ছে।

থ্রি-ফেজ সংযোগের ক্ষেত্রে মিটার ভাড়া যুক্ত হলে খরচ আরও বাড়ে। প্রিপেইড মিটারের ক্ষেত্রে সিঙ্গেল ফেজ মিটারের জন্য মাসে ৪০ টাকা এবং থ্রি-ফেজ মিটারের জন্য ২৫০ টাকা ভাড়া নেওয়া হয় বলে বিতরণ সংস্থাগুলোর হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রিপেইড মিটারে কীভাবে টাকা কাটা হয়?

বিদ্যুৎ বিল আদায় সহজ করা, বকেয়া কমানো এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে দেশে প্রিপেইড মিটার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমানে বিভিন্ন বিতরণ সংস্থার আওতায় বিপুলসংখ্যক প্রিপেইড মিটার রয়েছে।

বিতরণ সংস্থার হিসাবে, একটি সিঙ্গেল ফেজ প্রিপেইড মিটারের মূল্য প্রায় ৬ হাজার টাকা। ১০ বছরের আয়ুষ্কাল ধরে ১২০ মাসে মাসে ৪০ টাকা করে মিটার ভাড়া আদায় করা হয়। থ্রি-ফেজ মিটারের মূল্য প্রায় ২৫ হাজার টাকা ধরে মাসে ২৫০ টাকা ভাড়া নেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মিটার নষ্ট হলে বিতরণ সংস্থার পক্ষ থেকে তা পরিবর্তন করে দেওয়ার কথা রয়েছে।

প্রিপেইড মিটারে টাকা রিচার্জের সময় মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ এবং এনার্জি বিলের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট কেটে নেওয়া হয়। এরপর অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন গ্রাহক।

এ কারণে অনেক গ্রাহক বিদ্যুৎ ব্যবহার না করেও মিটার থেকে টাকা কেটে নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি ও আপত্তি জানাচ্ছেন। এর সঙ্গে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি থাকায় অসন্তোষ আরও বাড়ছে।

প্রিপেইড মিটার নিয়ে আপত্তি

প্রিপেইড মিটার চালুর উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকদের মধ্যে আপত্তি ও আন্দোলন দেখা দিয়েছে। নারায়ণগঞ্জে এ নিয়ে গণ-অনশন, সভা-সমাবেশ হয়েছে। গঠিত হয়েছে নাগরিক অধিকার ফোরাম।

ফোরামের প্রধান উপদেষ্টা মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, গ্রাহকেরা অগ্রিম টাকা দিতে আগ্রহী নন। তাঁর দাবি, এ বিষয়ে গণশুনানি করে জনগণকে বোঝানোর প্রয়োজন ছিল।

তিনি বলেন, নানা জটিলতার কারণে তারা প্রিপেইড মিটার গ্রহণ করতে চাইছেন না। তাঁর দাবি, দেশের প্রায় ৩০টি জেলার সঙ্গে তারা যোগাযোগ করেছেন এবং বিভিন্ন এলাকায় এ নিয়ে আন্দোলন চলছে।

নারায়ণগঞ্জে মিটার ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে।

ভোক্তা সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বলেন, ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া আদায় নিয়ে ভোক্তাদের প্রশ্ন তোলার যৌক্তিকতা রয়েছে। তাঁর মতে, মিটার ভাড়া বিতরণ চার্জের সঙ্গে সমন্বয় করা উচিত এবং ডিমান্ড চার্জও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, গ্রাহকের অনুমোদিত ডিমান্ড অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা না গেলে ডিমান্ড চার্জের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এ ধরনের চার্জের পেছনে বিতরণ সংস্থার প্রকৃত খরচ কত, সেটিও পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য

বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী বলেন, ডিমান্ড চার্জের বিনিময়ে গ্রাহক সারা মাস বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য অর্থ দেন। কিন্তু বাস্তবে বিদ্যুৎ সরবরাহ কম হলে গ্রাহকের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

প্রিপেইড মিটার নিয়ে গ্রাহকদের আন্দোলনকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার পরামর্শ দেন তিনি। তাঁর মতে, গ্রাহকদের আস্থা বাড়াতে মিটার ও বিল ব্যবস্থাপনা স্বাধীনভাবে অডিট, যাচাই ও পরীক্ষা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে গ্রাহকদের নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি।

বিতরণ সংস্থার বক্তব্য

ডিপিডিসির প্রকল্প পরিচালক মো. হানিফ উদ্দিন বলেন, প্রিপেইড মিটার নিয়ে গ্রাহকদের ভুল বোঝানো হচ্ছে। তাঁর দাবি, পোস্টপেইড থেকে প্রিপেইড মিটারে গেলে বিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়ে এবং এতে অতিরিক্ত কোনো অর্থ কাটা হয় না। পোস্টপেইডের মতো একই হারে ভ্যাট ও ডিমান্ড চার্জ নেওয়া হয়।

তিনি বলেন, গ্রাহক এককালীন মিটার কিনে না দিলে ভাড়া নেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীরা বর্তমানে বিদ্যুৎ বিলে ০.৫ শতাংশ রিবেট বা ছাড় পান।

বিদ্যুতের মিটার ও বিভিন্ন চার্জের যৌক্তিকতা নিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) আরও সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিইআরসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যাচাই-বাছাই করেই ডিমান্ড চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বশেষ বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলেও ডিমান্ড চার্জ বাড়ানো হয়নি। প্রিপেইড মিটার নিয়ে সরকার গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটিও যাচাই করে কোনো সমস্যা পায়নি বলে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে প্রিপেইড মিটারের ভাড়া নির্ধারণের বিষয়টি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের আওতাভুক্ত বলে জানানো হয়েছে।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদক: শাকিলা জাহান
মোবাইল: ০১৩০১১০৪০৭০ ই-মেইল: info@gbanglanews.com

অফিস :

জি.এম বাংলা লিমিটেডের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান।

৫৬-৫৭, শরীফ ম্যানশন, মতিঝিল রোড, ঢাকা-১০০০