সর্বজনীন পেনশনে শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি কীভাবে কার্যকর হবে?

আপলোড সময় : ২৪-০৯-২০২৬ ০৪:৩২:০৮ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৪-০৯-২০২৬ ০৪:৩২:০৮ অপরাহ্ন

বাংলাদেশের সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিদ্যমান চারটি স্কিমের পাশাপাশি আলাদা কোনো পঞ্চম স্কিম হিসেবে নয়, বরং প্রতিটি স্কিমের ইসলামিক ভার্সন হিসেবে এ পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ বলছে, দেশের আরও বেশি মানুষকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার আওতায় আনতে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে সুদভিত্তিক পদ্ধতিতে আগ্রহী নন—এমন ব্যক্তিদেরও সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে চালু হওয়া সর্বজনীন পেনশনের চারটি স্কিমে এখন পর্যন্ত নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার। এর মধ্যে ‘সমতা’ স্কিমে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৮৭ হাজার ২২৪ জন নিবন্ধিত হলেও ‘সুরক্ষা’, ‘প্রবাস’ ও ‘প্রগতি’ স্কিমে অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম।

কর্মসূচিতে জমা হওয়া প্রায় ৩২০ কোটি ৩০ লাখ টাকা সরকারি ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে নতুন পদ্ধতি হিসেবে শরিয়াহভিত্তিক ব্যবস্থা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থ বৈঠকে এ প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। নতুন পদ্ধতির আইনগত ভিত্তি তৈরিতে আইনের খসড়া প্রণয়ন করে তা জাতীয় সংসদে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) শেখ কামরুল হাসান বলেন, শরিয়াহভিত্তিক স্কিম আলাদা কোনো পঞ্চম স্কিম নয়; বিদ্যমান চারটি স্কিমেরই ইসলামিক ভার্সন হবে। অর্থাৎ ‘প্রবাস’, ‘প্রগতি’, ‘সুরক্ষা’ ও ‘সমতা’—প্রতিটি স্কিমেই প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকবে।

তিনি বলেন, গ্রাহকের সামনে দুটি বিকল্প থাকবে—প্রচলিত মুনাফা পদ্ধতি অথবা শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি। কেউ সুদভিত্তিক পদ্ধতিতে অংশ নিতে না চাইলে শরিয়াহ পদ্ধতি বেছে নিতে পারবেন।

পেনশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও স্থানীয় পরামর্শকেরা শরিয়াহভিত্তিক ব্যবস্থার কাঠামো, পরিচালন পদ্ধতি, বিনিয়োগ ব্যবস্থা ও কারিগরি বিষয় নিয়ে কাজ করছেন। একই সঙ্গে এর আর্থিক স্থায়িত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি দায়-দায়িত্ব নিয়েও বিশ্লেষণ করা হবে।

শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতিতে আলাদা শরিয়াহ বোর্ড গঠন করা হবে কি না, সুকুক বন্ডসহ কোন কোন খাতে বিনিয়োগ করা যাবে—এসব বিষয়ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। শেখ কামরুল হাসান জানান, আপাতত বাংলাদেশ ব্যাংকের শরিয়াহ বোর্ড এবং সরকারি বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত শরিয়াহ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়া হবে।

তবে এ পদ্ধতি চালুর ক্ষেত্রে বিনিয়োগ কাঠামো, মুনাফার হার ও গ্রাহকের আস্থা অর্জনসহ বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাতসংশ্লিষ্টরা।

প্রচলিত পেনশন তহবিল সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগের মাধ্যমে নির্দিষ্ট হারে সুদ পায়। কিন্তু শরিয়াহভিত্তিক তহবিল সুদভিত্তিক বিনিয়োগ করতে পারবে না। ফলে গ্রাহকের অর্থ কোন খাতে এবং কীভাবে বিনিয়োগ করা হবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক মো. আহসান হাবীব মনে করেন, সর্বজনীন পেনশনে পণ্যের বৈচিত্র্য না আনলে সব শ্রেণির মানুষকে এ কর্মসূচির আওতায় আনা কঠিন হবে। তার মতে, দেশের একটি শ্রেণির মানুষ সুদভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা গ্রহণ না করে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। তাই গ্রাহকদের ভিন্ন চাহিদা বিবেচনায় পণ্যের বৈচিত্র্য গুরুত্বপূর্ণ।

আর্থিক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি কার্যকর করতে শরিয়াহসম্মত সুকুক বন্ড, ইসলামিক ইক্যুইটি এবং হালাল ব্যবসায় মুদারাবা বা মুশারাকা মডেলে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে হবে। তবে বাংলাদেশে সুকুকের বাজার এখনো তুলনামূলক ছোট। পর্যাপ্ত শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা না গেলে প্রচলিত স্কিমের তুলনায় মুনাফা কম হতে পারে, যা গ্রাহকের আগ্রহে প্রভাব ফেলতে পারে।

গ্রাহকের আস্থা তৈরির জন্য শক্তিশালী ও স্বাধীন শরিয়াহ বোর্ড, নিয়মিত শরিয়াহ অডিট এবং বিনিয়োগের বিষয়ে স্বচ্ছ প্রতিবেদন প্রকাশের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

অধ্যাপক আহসান হাবীব বলেন, অতীতে কিছু ইসলামি ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পেছনে ব্যাংকিং মডেলের চেয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বড় কারণ ছিল। তার মতে, রাজনৈতিকভাবে ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও দখলের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে সমস্যা তৈরি হয়েছিল।

শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতির পাশাপাশি বিদ্যমান সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় আরও কিছু পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পেনশনারের মৃত্যুর পর তার স্বামী বা স্ত্রী যে বয়স পর্যন্ত পেনশন পাবেন, তা ৭৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৮০ বছর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পেনশনার নিজে জীবদ্দশায় আজীবন পেনশন পাবেন।

এ ছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

সরকারি মালিকানাধীন যেসব প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির কর্মীরা প্রচলিত সরকারি পেনশন পান না, তাদের ‘প্রগতি’ স্কিমের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘প্রবাস’ স্কিমে অংশগ্রহণ বাড়াতে বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীদের এ বিষয়ে অবহিত করা এবং বিমানবন্দরে নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে নিবন্ধনে দেওয়া প্রণোদনা ১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা করা হয়েছে।

এ ছাড়া পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করা, পেনশন তহবিল থেকে ঋণ দেওয়ার সুযোগ এবং স্বাস্থ্যবিমা যুক্ত করা যায় কি না—এসব বিষয়ও পর্যালোচনা করছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ।

শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি চালুর ক্ষেত্রে এখন মূলত আইনগত কাঠামো চূড়ান্ত করা, বিনিয়োগের উপযুক্ত ক্ষেত্র নির্ধারণ এবং শরিয়াহ তদারকির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো সামনে রয়েছে। কর্তৃপক্ষের মতে, এসব কাঠামো কার্যকরভাবে তৈরি করা গেলে সুদ এড়িয়ে চলতে চান—এমন আরও মানুষকে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে যুক্ত করা সম্ভব হতে পারে।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদক: শাকিলা জাহান
মোবাইল: ০১৩০১১০৪০৭০ ই-মেইল: info@gbanglanews.com

অফিস :

জি.এম বাংলা লিমিটেডের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান।

৫৬-৫৭, শরীফ ম্যানশন, মতিঝিল রোড, ঢাকা-১০০০