পর্যটনের অপার সম্ভাবনা, তবু বিদেশি পর্যটকে ভাটা

আপলোড সময় : ২৭-০৯-২০২৬ ০৭:৫০:৫০ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ২৭-০৯-২০২৬ ০৭:৫০:৫০ পূর্বাহ্ন

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। পাহাড়, ঝরনা, নদী, হাওর, বন, সমুদ্রসৈকত ও প্রাচীন স্থাপত্য—বৈচিত্র্যময় এসব আকর্ষণ ছড়িয়ে আছে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি সৌন্দর্য কিংবা সিলেটের চা-বাগান ও ঝরনা—বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মতো উপকরণের কোনো ঘাটতি নেই। এর সঙ্গে রয়েছে শত বছরের ইতিহাস, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, লোকজ সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্যময় জীবনযাত্রা।

অথচ বিপুল এই সম্ভাবনার বিপরীতে বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা এখনো আশানুরূপ নয়। কয়েক বছর আগেও প্রতিবছর অর্ধলাখের বেশি বিদেশি পর্যটক এলেও সাম্প্রতিক সময়ে এই সংখ্যা কমেছে। পর্যটনশিল্পকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বিদেশি পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশ এখনো বড় পরিসরে আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠতে পারেনি।

প্রশ্ন উঠছে—এত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক নিদর্শন ও পর্যটন-সম্ভাবনা থাকার পরও বিদেশি পর্যটক টানতে বাংলাদেশ পিছিয়ে কেন? কোথায় ঘাটতি এবং কীভাবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব?

প্রচার ও যোগাযোগব্যবস্থায় ঘাটতি

বাংলাদেশে কক্সবাজার, সুন্দরবন, পাহাড়পুর, বাগেরহাট, সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে। তবে এসব স্থান সম্পর্কে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পর্যাপ্ত প্রচার ও ব্র্যান্ডিং না থাকায় অনেক বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশকে তাদের ভ্রমণ তালিকায় রাখেন না।

এ ছাড়া অনেক পর্যটনকেন্দ্রে পৌঁছানোর জন্য উন্নত সড়ক, গণপরিবহন কিংবা সরাসরি যাতায়াতের সুবিধা পর্যাপ্ত নয়। রাজধানী বা বিমানবন্দর থেকে দূরবর্তী পর্যটনকেন্দ্রে যেতে দীর্ঘ সময় লাগে। এতে বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণ পরিকল্পনা জটিল হয়ে পড়ে।

বিদেশি পর্যটকের হালচাল

বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি এসেছেন ভারতীয় পর্যটক। তাদের কেউ ব্যবসায়িক কাজে, কেউ চাকরি, কেউ শিক্ষার জন্য এবং কেউ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে এসেছেন। পর্যটন বোর্ডের হিসাবে এসব আগত ব্যক্তিকে পর্যটক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ভারতের পর চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, নেপাল ও সৌদি আরবের নাগরিকরাও বাংলাদেশে ভ্রমণ করেছেন।

পর্যটন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে এসব দেশ থেকে বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার পর্যটক এসেছিলেন। ২০১৫ সালে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার, ২০১৬ সালে প্রায় ১ লাখ ৮২ হাজার, ২০১৭ সালে প্রায় ২ লাখ ৩২ হাজার, ২০১৮ সালে প্রায় ২ লাখ ৬৭ হাজার এবং ২০১৯ সালে প্রায় ৩ লাখ ২৩ হাজার।

করোনাভাইরাস মহামারির পর পর্যটক আগমনে ভাটা পড়ে। তবে পরবর্তী সময়ে আবার বিদেশি পর্যটক আসতে শুরু করেন। ২০২২ সালে বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটক এসেছেন ৫ লাখ ২৯ হাজার এবং ২০২৩ সালে ৬ লাখ ৫৫ হাজার। গত দুই বছরের হিসাব এখনো পর্যটন বোর্ডের হাতে আসেনি।

থাই পর্যটকের চোখে সমস্যা ও সম্ভাবনা

সম্প্রতি থাইল্যান্ডের নারী পর্যটক লিও বাংলাদেশে এসে খুলনা, সিলেট, রাজশাহী ও কক্সবাজার ঘুরেছেন। তিনি থাইল্যান্ডের একটি ট্যুর অপারেটর পরিচালনা করেন এবং সেখান থেকে পর্যটকদের বাংলাদেশে পাঠানোর সঙ্গে যুক্ত।

সাত দিনের ভ্রমণ শেষে বাংলাদেশের পর্যটন সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে তিনি যোগাযোগব্যবস্থার সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তার কাছে পর্যটকদের জন্য অন্যতম সমস্যা মনে হয়েছে অটোরিকশা। যানজটের কারণে বিভিন্ন স্থানে যেতে অনেক সময় লেগেছে বলেও জানান তিনি।

তবে তার মতে, বাংলাদেশে পর্যটক আকর্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক উপাদানই রয়েছে। যাতায়াতের সময় কমিয়ে আনা গেলে বিদেশি পর্যটকদের আরও আকৃষ্ট করা সম্ভব। পাশাপাশি পর্যটনসমৃদ্ধ জেলাগুলোর হোটেল ও মোটেলে বিদেশিদের জন্য বিনোদন সুবিধা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

নিরাপত্তা, অবকাঠামো ও ভ্রমণ অনুমতিতে জটিলতা

পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নত সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে দক্ষতার ঘাটতি, হোটেল ভাড়া ও খাবারের তুলনামূলক বেশি খরচ, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এর পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের ই-ভিসা পাওয়া এবং সুন্দরবন ও পার্বত্য চট্টগ্রামে ভ্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় পূর্বানুমতি পেতেও সময় লাগে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তাদের মতে, অন-অ্যারাইভাল ভিসা ব্যবস্থার নানা জটিলতাও বিদেশি পর্যটকদের জন্য বিরূপ অভিজ্ঞতা তৈরি করছে। অনেক সময় বিমানবন্দরে এসে ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়া, কাগজপত্র যাচাইসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় তিন-চার ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। ই-ভিসা ব্যবস্থা দ্রুত ও সহজ করা গেলে এ ধরনের ভোগান্তি কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।

হোটেল ও খাবারের খরচ নিয়েও অভিযোগ

পর্যটনসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ভারতের দিল্লি, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর, শ্রীলঙ্কার কলম্বো ও নেপালের কাঠমান্ডুর তুলনায় ঢাকার হোটেল ভাড়া অনেক বেশি। খাবারের দামও তুলনামূলক বেশি হলেও মান সব সময় সে অনুযায়ী পাওয়া যায় না।

বাংলাদেশে বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে কয়েক হাজার বিদেশি কাজ করছেন। ছুটিতে তাদের অনেকেই থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও ভারতে ভ্রমণে যান। দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে তারা কেন কম যান, তা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশিরা যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা চান, দেশের অনেক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টে তা পর্যাপ্ত নয়। ফলে তারা দেশের বাইরে ভ্রমণকে বেশি গুরুত্ব দেন।

বিদেশি পর্যটক বাড়াতে প্রচারের ওপর জোর

ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সাবেক সভাপতি শিবলুল আযম কোরেশী বলেন, বিদেশি পর্যটক কম আসার অন্যতম কারণ দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলো নিয়ে পর্যাপ্ত প্রচার না থাকা। ফলে বিদেশিরা বাংলাদেশের পর্যটন সম্পর্কে তেমন জানেন না।

তার মতে, বাংলাদেশকে নিয়ে কিছু নেতিবাচক প্রচারণাও রয়েছে, যা পর্যটন খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বিদেশে বাংলাদেশের পর্যটন তুলে ধরতে বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশি মিশনগুলোকে আরও সক্রিয় করার পরামর্শ দিয়েছেন ট্যুর অপারেটররা। তাদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে এবং মানসম্মত তথ্যচিত্র তৈরি করে বিদেশে প্রচারণা চালানো যেতে পারে। পাশাপাশি বিদেশি ইউটিউবার ও ব্লগারদের বাংলাদেশে এনে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে।

সরকার যা ভাবছে

বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটক আসার হার বর্তমানে কিছুটা কমেছে বা প্রত্যাশিত গতিতে বাড়ছে না। এর অন্যতম কারণ প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে পর্যটকের প্রবাহ কমে যাওয়া। কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাবেও পর্যটন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় পর্যটন প্রচারণায় ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশি পর্যটকেরা যেন ঘরে বসেই বাংলাদেশের পর্যটনকেন্দ্র সম্পর্কে জানতে পারেন, সে জন্য বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল কনটেন্ট, গল্প, ভিডিও ও প্রচারণা তৈরি করা হচ্ছে। দেশি-বিদেশি ইনফ্লুয়েন্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মাধ্যমেও বাংলাদেশের পর্যটনস্থানের প্রচার করা হচ্ছে।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা ও বিভিন্ন ফেয়ারে বাংলাদেশ অংশ নিয়ে দেশের পর্যটন সম্ভাবনা তুলে ধরছে এবং বিদেশিদের বাংলাদেশ ভ্রমণে উৎসাহিত করছে। বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন দূতাবাস ও মিশনকেও ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে কূটনৈতিক কার্যক্রমের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যটন প্রচারণা জোরদারের চেষ্টা চলছে।

প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের দিক থেকে বাংলাদেশের সম্ভাবনা থাকলেও সেই সম্ভাবনাকে বিদেশি পর্যটকের কাছে কার্যকরভাবে তুলে ধরা, যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন, ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা এবং পর্যটনসেবার মান বাড়ানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদক: শাকিলা জাহান
মোবাইল: ০১৩০১১০৪০৭০ ই-মেইল: info@gbanglanews.com

অফিস :

জি.এম বাংলা লিমিটেডের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান।

৫৬-৫৭, শরীফ ম্যানশন, মতিঝিল রোড, ঢাকা-১০০০